প্রতিবাদের ভাষা: কেন রাজনীতিতে ডিম ছোড়া হয়?
প্রতিবাদের ভাষা: কেন রাজনীতিতে ডিম ছোড়া হয়?

মঞ্চে বক্তৃতা দিচ্ছেন কোনও রাজনীতিক। হঠাৎ ভিড়ের ভেতর থেকে ছুটে এলো একটি ডিম। মুহূর্তেই তা ভেঙে পড়লো তাঁর গায়ে। কয়েক সেকেন্ডের এই ঘটনাই অনেক সময় হয়ে ওঠে বড় খবর। বিশ্বজুড়ে এমন ঘটনা নতুন নয়। রাজা-মন্ত্রী থেকে বিতর্কিত রাজনীতিক— অনেকেই ক্ষুব্ধ মানুষের ছোড়া ডিমের মুখে পড়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে মানুষ ডিমই কেন বেছে নেয়?

ডিম কেন প্রতিবাদের প্রতীক?

বিশ্লেষকদের মতে, ডিম শুধু খাবার নয়, বহু সমাজে এটি অপমান ও প্রত্যাখ্যানের প্রতীক। এটি বড় ধরনের শারীরিক ক্ষতি করে না, কিন্তু জনসমক্ষে কাউকে বিব্রত করতে পারে প্রবলভাবে। সস্তা, সহজলভ্য এবং তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ডিম ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এই ধরনের প্রতিবাদ আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ‘এগিং’ নামে।

ইতিহাস ও আলোচিত ঘটনা

ইতিহাস বলছে, ইউরোপে বহু আগে থেকেই জনসমক্ষে অপছন্দের ব্যক্তি বা খারাপ অভিনয়ের প্রতিবাদে পচা ফল ও ডিম ছোড়ার রীতি ছিল। পরে তা রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে অনেক আলোচিত ঘটনাও ঘটেছে। ১৯১০ সালে ব্রিটেনে উইনস্টন চার্চিলের দিকে ডিম ছোড়া হয়। ২০০১ সালে নির্বাচনি প্রচারে ব্রিটিশ উপ-প্রধানমন্ত্রী জন প্রেসকটের দিকে ডিম ছোড়া হলে তিনি পাল্টা ঘুষি মেরে আলোচনায় আসেন। ২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার সিনেটর ফ্রেজার অ্যানিংয়ের মাথায় ডিম ভেঙে দেওয়া কিশোর উইল কনোলি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি পান ‘এগ বয়’ নামে। এমনকি ২০২২ সালে ইংল্যান্ডে রাজা তৃতীয় চার্লসের দিকেও ডিম ছোড়া হয়েছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ডিম কেন মাছ বা মাংসের চেয়ে জনপ্রিয়?

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ডিম ছোড়ার উদ্দেশ্য মূলত শারীরিক আঘাত নয়; বরং প্রতীকী বার্তা দেওয়া—‘আমরা তোমাকে প্রত্যাখ্যান করছি’ বা ‘তোমার কাজ গ্রহণযোগ্য নয়’। মাছ বা মাংসের বদলে ডিম জনপ্রিয় হওয়ার পেছনেও আছে বাস্তব কারণ। ডিম সহজে বহন করা যায়, শরীরে লাগলে সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে নোংরা পরিস্থিতি তৈরি করে এবং অপমানের বার্তাটাও দ্রুত পৌঁছে দেয়। মাছ বা মাংস তুলনায় ভারী, ব্যয়বহুল এবং ব্যবহারেও ঝামেলাপূর্ণ।

ডিম নিক্ষেপের শাস্তি

প্রতীকী ভাষা হিসেবে পরিচিতি পেলেও অনেক দেশে ডিম নিক্ষেপ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ, এটি জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে এবং সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কারও গায়ে ডিম ছুঁড়ে মারা আইনের চোখে আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়। জনসমক্ষে করলে এটি জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের মতো আইনে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। রাজনৈতিক বা আদর্শিক ঘৃণা থেকে যদি কারও ওপর আক্রমণ হিসেবে ডিম নিক্ষেপ করা হয়, তাহলে অনেক দেশে এর জন্য শাস্তির বিধান আছে।

যুক্তরাষ্ট্রে শাস্তি

যুক্তরাষ্ট্রে কেউ অন্যকে লক্ষ্য করে ডিম ছুঁড়ে মারলে তা সরাসরি আঘাত হিসেবে ধরা হয়। এ ধরনের ঘটনা শুধু অসদারচরণমূলক মনে হলে এবং গুরুতর আঘাত না হলে শাস্তি হতে পারে সর্বোচ্চ ১ বছর পর্যন্ত জেল বা ৫০০ থেকে ১০০০ ডলার জরিমানা ও প্রোবেশন বা কমিউনিটি সার্ভিস। গাড়িতে ডিম নিক্ষেপে শাস্তি হতে পারে ১-৫ হাজার ডলার জরিমানা এবং সর্বোচ্চ ৬ মাস পর্যন্ত জেল।

বাংলাদেশে শাস্তি

আর বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ধারা ৩২৩, ৫০৬ অনুসারে কারও ওপর এই ধরনের ঘটনায় শারীরিক আঘাত, ভীতি প্রদর্শন বা জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আসতে পারে। বাংলাদেশের পেনাল কোড ৩২৩ ও ৫০৬ অনুযায়ী সাধারণ আঘাত বা হুমকির শাস্তি ১ থেকে ৩ মাসের জেল বা ৫০০ টাকা জরিমানা। তবে এই শাস্তি হামলার ফলাফল প্রমাণ এবং আঘাতের তীব্রতার ওপর নির্ভর করে।