পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পশু জবাই সংক্রান্ত সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তি ও কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করায় রাজ্যের মুখ্যসচিব, প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন দপ্তরের সচিব এবং স্বরাষ্ট্র দপ্তরের প্রধান সচিবের কাছে আদালত অবমাননার নোটিশ পাঠানো হয়েছে। ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে এ ঘটনায় রাজ্যজুড়ে কুরবানি নিয়ে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বাড়ছে।
আদালতের নির্দেশ ও সরকারের নিষ্ক্রিয়তা
গবাদিপশু জবাই সংক্রান্ত রাজ্যের বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে একাধিক মামলা দায়ের হয়। এর মধ্যে সামাজিক ন্যায়বিচার ফোরামের করা মামলায় প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের ডিভিশন বেঞ্চ গত বৃহস্পতিবার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেয়। আদালত পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইনের ১২ ধারার আওতায় কিছু ক্ষেত্রে শিথিলতা দেওয়া যায় কিনা, তা বিবেচনা করতে রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেয়। এ বিষয়ে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাতেও বলা হয়েছিল।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও রাজ্য সরকার এ বিষয়ে কোনও নির্দেশিকা প্রকাশ করেনি। সংবাদমাধ্যমেও কোনও সরকারি অবস্থান জানানো হয়নি। এরপরই আদালতের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগ তুলে রাজ্যের তিন শীর্ষ কর্মকর্তার কাছে আদালত অবমাননার নোটিশ পাঠানো হয়।
আইনজীবীদের বক্তব্য
সামাজিক ন্যায়বিচার ফোরামের পক্ষে আইনজীবী নাসিরুল হক নোটিশ পাঠান। তিনি বলেন, আদালত স্পষ্টভাবে বলেছিল আইন অনুযায়ী ছাড় বা শিথিলতার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু সরকার সেই নির্দেশ কার্যকর করেনি।
এ মামলায় আরও বেশ কয়েকজন আইনজীবী রাজ্যের বিজ্ঞপ্তির সমালোচনা করেন। আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য আদালতে বলেন, ১৯৫০ সালের পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন মূলত কৃষিকাজের স্বার্থে গবাদিপশু রক্ষার জন্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে কৃষিকাজ আর গরু বা মহিষের ওপর নির্ভরশীল নয়। তার দাবি, আইনটির ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে এবং মূলত পৌর এলাকার মধ্যেই এটি প্রযোজ্য ছিল।
আইনজীবীদের একাংশের বক্তব্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরোনো আইনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে ভাবা প্রয়োজন। অন্যদিকে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এখনও প্রকাশ্যে বিস্তারিত কোনও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
ঈদুল আজহা ও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ
আগামী ২৮ মে ঈদুল আজহা। মুসলমানদের অন্যতম বড় এ ধর্মীয় উৎসবে কুরবানির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ফলে পশু জবাই নিয়ে প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন গবাদিপশু ব্যবসায়ী ও খামারিরা। বছরের এ সময়টিতে কুরবানির পশু বিক্রির জন্য তারা দীর্ঘ প্রস্তুতি নেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির কারণে অনেকেই আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন পশুর হাটেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বলে জানা গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারি অবস্থান স্পষ্ট না হওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যেও দ্বিধা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মীয় অনুভূতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং আইনি জটিলতা মিলিয়ে বিষয়টি এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর অবস্থায় পৌঁছেছে। ঈদের আগে আদালতের পরবর্তী অবস্থান এবং রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে সাধারণ মানুষ।



