বিএনপি সরকারের আমলে বিলুপ্ত হলো সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, আদালত অবমাননা নিয়ে বিতর্ক
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত, আদালত অবমাননা বিতর্ক

দীর্ঘদিন আন্দোলন করলেও বিএনপি সরকারের আমলেই বিলুপ্ত হয়েছে বহুল প্রত্যাশিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হাইকোর্টের রায়ের আলোকে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠিত হলেও এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ সংসদে বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কর্মরতদেরও ফিরিয়ে নেওয়া হয় আইন মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু বিচার শেষের (আপিল বিভাগের) আগেই এভাবে সবকিছু বিলুপ্তি ঘটানোর বিষয়টিকে আদালত অবমাননা শামিল বলে দাবি করা হচ্ছে। যদিও এসব কার্যক্রম আদালত অবমাননার শামিল কিনা তা নিয়ে রয়েছে ভিন্ন মত।

পটভূমি ও মামলার ধারাবাহিকতা

২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাদ্দাম হোসেনসহ সাত আইনজীবী বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং ২০১৭ সালের জুডিসিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং বিচার বিভাগীয় পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। পরে ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট একই বছরের ২৭ অক্টোবর রুল জারি করেন। রুলে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং এ সংক্রান্ত ২০১৭ সালের জুডিসিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। একইসঙ্গে বিচার বিভাগীয় পৃথক সচিবালয় কেন প্রতিষ্ঠা করা হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয় রুলে। আইন মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়।

এরপর ওই রুলের শুনানি নিয়ে ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে রায় দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ ও হাইকোর্টের রায়

বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলাবিধান রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি তা প্রয়োগ করে থাকেন। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে, অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিষয় সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত ছিল। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়। পরে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ‘এবং সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা প্রযুক্ত হবে’ শব্দগুলো যুক্ত করা হয়।

১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে হাইকোর্ট তার রায়ে বলেছেন, ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৩৯ ধারা অনুসারে ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বাতিল করা হলো। একইভাবে ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনী আইনের ১৯ ধারার মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনও সাংঘর্ষিক বলে বাতিল করা হলো। রায়ে আরও বলা হয়েছে, সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী ও ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ের নজির অনুসারে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ১১৬ অনুচ্ছেদ যেভাবে ছিল, সে রকম স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিভাইভ (পুনরুজ্জীবিত) ও সংবিধানে পুনর্বহাল হবে। এই আদালতের রায়ের দিন থেকে এটি কার্যকর হবে। এছাড়া ২০১৭ সালের জুডিসিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট।

অধ্যাদেশ জারি ও বিলুপ্তি

ওই রায়ের পর ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারী করা হয়। যার ফলে নির্বাহী বিভাগ থেকে পুরোপুরি পৃথক হয় বিচার বিভাগ। রাষ্ট্রপতির নির্দেশে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ অধ্যাদেশ জারি করে। এমনকি ওই অধ্যাদেশের আলোকে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় উদ্বোধন করেন। এর পরপরই এই সচিবালয়ের আংশিক কাজও শুরু হয়েছিল।

কিন্তু চলতি বছরের ৯ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ও বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে বাতিল করা হয়। ফলে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নেমে আসে অন্ধকার। সবশেষ গত ১৯ এপ্রিল ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ বিলুপ্ত করে এই সচিবালয়ের সিনিয়র সচিবসহ ১৫ জন কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এই বিষয়ে রাষ্ট্রপতির আদেশে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ। এছাড়া আরেকটি পৃথক আদেশে এই কর্মকর্তাদের আইন মন্ত্রণালয়ের যোগদানের তারিখ দেখানো হয়েছে ১০ এপ্রিল।

আদালত অবমাননা বিতর্ক

তবে রিটকারীদের আইনজীবী মুহাম্মদ শিশির মনির সরকারের এমন কার্যক্রমকে আদালত অবমাননার শামিল বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগের ওপর সরকারের দমন-পীড়ন রোধে আমরা এই রিট করেছিলাম। সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সম্প্রতি হাইকোর্ট এ মামলার ১৮৫ পৃষ্ঠার রায়ও প্রকাশ করেছেন। বিষয়টি এখনও আদালতে বিচারাধীন। এ অবস্থায় সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তির বিষয়টি আদালত অবমাননা।’ আদালত অবমাননার ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আবেদন করার অভিমতও ব্যক্ত করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

জানা গেছে, সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক স্বাধীন সচিবালয় করার নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ের বিরুদ্ধে গত ২১ মে আপিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নিয়ে জারিকৃত অধ্যাদেশটি সংসদে পাস হয়নি, ফলে এটি আইনে রূপান্তরিত হয়নি, সেহেতু পৃথক সচিবালয় কাজ করে কীভাবে জানিয়ে পাল্টা প্রশ্ন তোলেন বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল। তিনি বলেন, ‘যেহেতু অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত হয়নি সেহেতু এখানে আদালত অবমাননা হবে না। অধ্যাদেশটি যদি সংসদে পাস হতো— সেক্ষেত্রে অবমাননার সুযোগ থাকতো। পরবর্তীকালে এই অধ্যাদেশটির সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বিল আকারে সংসদে আনা হবে। যেন অধ্যাদেশটি নিয়ে আর কোনও বিতর্ক বা সমালোচনার সুযোগ না থাকে। সুতরাং, সার্বিক দিক থেকে এখানে আদালত অবমাননার কিছু নেই, এখানে কোনও আদালত অবমাননা হয়নি।’

ভিন্ন মত জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, ‘শুধু স্বাধীনতা দিলেই হবে না, বিচারপ্রার্থীরা যে ন্যায়বিচার পাবেন, তার নিশ্চয়তা কোথায়? সেটা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত হবে না, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আইনের চোখে থাকলেই হবে না— যদি না ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। আইন করে শুধু বিচারকদের বদলি-প্রমোশনের ক্ষমতা দিলেই বিচার বিভাগ স্বাধীন হয় না। যে আদালত আইনগত বিষয়ে জামিন দিতে সাহস পায় না, তাকে স্বাধীনতা দিয়ে লাভ কী? জনগণের কোনও লাভ নেই। আর যেটি (অধ্যাদেশ) আইনে পরিণত হয়নি, সেখানে আদালত অবমাননা হয় কীভাবে?’