পাকিস্তান-চীন সম্পর্ক: শাক্সগাম হস্তান্তর থেকে পারমাণবিক সহযোগিতা
পাকিস্তান-চীন সম্পর্ক: শাক্সগাম হস্তান্তর থেকে পারমাণবিক সহযোগিতা

পাকিস্তান-চীন সম্পর্কের সূচনা

১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ দিল্লিতে চীনের জাতীয়তাবাদী নেতা চিয়াং কাই-শেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। চিয়াং তার ডায়েরিতে জিন্নাহকে 'অসৎ' বলে উল্লেখ করেন এবং ব্রিটিশদের দ্বারা ব্যবহৃত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন। ইতিহাসবিদ রানা মিটারের মতে, চিয়াং বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতি পছন্দ করতেন না। তবে নয় বছর পর, জিন্নাহর প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানই প্রথম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে ১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনকে স্বীকৃতি দেয়।

শাক্সগাম উপত্যকা হস্তান্তর

১৯৬৩ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তান হংকংয়ের চেয়ে পাঁচ গুণ বড় শাক্সগাম উপত্যকা চীনের হাতে তুলে দেয়। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে এই হস্তান্তর সম্পন্ন হয়, যা পাকিস্তান-চীন সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করে। সাবেক ব্রিগেডিয়ার ফিরোজ হাসান খান একে 'রাষ্ট্রনায়কোচিত কূটনীতির চমৎকার উদাহরণ' বলে অভিহিত করেন।

পারমাণবিক সহযোগিতা

১৯৭৬ সালে চীন ও পাকিস্তান একটি দ্বিপাক্ষিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশকে চীন পাকিস্তানকে অস্ত্রের নকশা এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরবরাহ করেছিল। তবে উভয় সরকারই পারমাণবিক বিস্তারের দায় এড়াতে এই সহযোগিতা অস্বীকার করে। ১৯৯৮ সালে পাকিস্তানের পারমাণবিক পরীক্ষার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিন্দা প্রস্তাবে বাধা দেয় চীন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গোপন কূটনীতি

১৯৭১ সালের জুলাইয়ে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে চড়ে বেইজিং যান, যা নিক্সনের চীন সফরের পথ উন্মুক্ত করে। অধ্যাপক কারাইয়ের মতে, পাকিস্তান এই মধ্যস্থতার জন্য আনুষ্ঠানিক পুরস্কার পায়নি। তবে সাবেক রাষ্ট্রদূত সরদার মাসুদ খান মনে করেন, চীন বছরের পর বছর পাকিস্তানের ভূমিকা স্বীকার করেছে।

সিপেক প্রকল্প

২০১৫ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ৬২ বিলিয়ন ডলারের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপেক) ঘোষণা করেন। প্রকল্পটি পাকিস্তানের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ালেও ঋণ সংকট সমাধান করতে পারেনি। গোয়াদর বন্দরকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা উদ্বেগ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশীদারত্বের অভাব প্রকল্পটিকে বাধাগ্রস্ত করছে। ২০২১ সাল থেকে পাকিস্তানে হামলায় অন্তত ২০ জন চীনা নাগরিক নিহত হয়েছেন।

সামরিক নির্ভরতা

বর্তমানে পাকিস্তানের অস্ত্র আমদানির ৮০ শতাংশ আসে চীন থেকে। যৌথভাবে উৎপাদিত জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান, ফ্রিগেট এবং এইচকিউ-৯ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে চীনা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে একীভূত করেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

২০২৬ সালের মে মাসে পাকিস্তান চীনের পুঁজিবাজারে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের 'পান্ডা বন্ড' ইস্যু করে। তবে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট, সিপেকের ঋণ এবং চীন-ভারত সম্পর্কের উষ্ণতা ইসলামাবাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খান মনে করেন, বর্তমান বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানের ভূমিকা ১৯৭১ সালের চেয়েও বেশি দায়িত্বশীল।