পশ্চিমবঙ্গের বহুল আলোচিত আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের তরুণী চিকিৎসক ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় ফের নতুন মোড় এসেছে। অভয়ার বাবা-মায়ের আবেদনের ভিত্তিতে কলকাতা হাইকোর্ট এবার নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। আদালতের নির্দেশে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার অধীনে তিন সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হবে। এই দল ঘটনার রাত থেকে শেষকৃত্য পর্যন্ত পুরো ঘটনাক্রম নতুন করে খতিয়ে দেখবে।
বিশেষ তদন্ত দল গঠন
আদালত জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার পূর্বাঞ্চলীয় যুগ্ম অধিকর্তার নেতৃত্বে এই বিশেষ তদন্ত দল কাজ করবে। আগামী ২৫ জুন মামলার পরবর্তী শুনানিতে তদন্তের অগ্রগতি সংক্রান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে হবে।
ঘটনার বিবরণ
গত ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নাইট শিফটে যোগ দিতে যান এক তরুণী চিকিৎসক। সেই রাতেই হাসপাতালের সেমিনার হল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার হয়। অভিযোগ ওঠে, তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার পর ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে রাজ্যজুড়ে।
পূর্বের তদন্ত
প্রথমে কলকাতা পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং সঞ্জয় রায় নামে এক সিভিক ভলান্টিয়ারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্তভার কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার হাতে যায়। তদন্ত শেষে আদালত সঞ্জয় রায়কে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়।
অসন্তোষ ও নতুন তদন্তের দাবি
তবে শুরু থেকেই তদন্তে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছিলেন নিহত চিকিৎসকের বাবা-মা। তাদের দাবি, এই ঘটনায় আরও অনেকে জড়িত থাকতে পারে এবং পুরো সত্য এখনও সামনে আসেনি। তাদের অভিযোগের ভিত্তিতেই নতুন করে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া হয়।
রাজনৈতিক প্রভাব
সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের আগেও এই ঘটনা রাজ্যের রাজনীতিতে বড় ইস্যু হয়ে উঠেছিল। নির্বাচনী প্রচারে বিজেপির পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, ক্ষমতায় এলে আর জি কর মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত নতুন করে শুরু করা হবে। নিহত চিকিৎসকের মা রত্না দেবনাথও সুবিচারের দাবিতে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হন এবং পানিহাটি কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
প্রশাসনিক ব্যবস্থা
ক্ষমতায় আসার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মামলার পুরনো নথি পুনরায় খোলার নির্দেশ দেন। ইতোমধ্যে তৎকালীন পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েল, তৎকালীন ডিসি সেন্ট্রাল ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং তৎকালীন ডিসি নর্থ অভিষেক গুপ্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
নতুন তদন্তের পরিধি
আদালত সূত্রে জানা গেছে, নতুন তদন্তে শুধু মূল অপরাধ নয়, ঘটনার পর প্রশাসনিক ভূমিকা, তথ্য গোপনের অভিযোগ এবং তদন্তে সম্ভাব্য গাফিলতির বিষয়ও খতিয়ে দেখা হবে। ঘটনার রাত থেকে শেষকৃত্য পর্যন্ত কারা কী ভূমিকা পালন করেছিলেন, কার সঙ্গে কার যোগাযোগ হয়েছিল, কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ ছিল কি না, তাও যাচাই করবে তদন্তকারী দল।
এছাড়া তৎকালীন সরকারের কোনো উচ্চপর্যায়ের নির্দেশ ফোন বা বার্তার মাধ্যমে দেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে বলে জানা গেছে। শুনানির সময় হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার ভূমিকাও নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আদালত জানতে চায়, ২০২৪ সালের অক্টোবরে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার পর গত এক বছর সাত মাসে তদন্তে কী অগ্রগতি হয়েছে। জবাবে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা জানায়, তারা ৭০ থেকে ৮০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, হাইকোর্টের এই নির্দেশ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ আদালত কার্যত ইঙ্গিত দিয়েছে, আগের তদন্তে কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। ফলে নতুন তদন্তে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।
মানবাধিকার ও চিকিৎসক সংগঠনের প্রতিক্রিয়া
মানবাধিকার কর্মী এবং চিকিৎসক সংগঠনগুলোর একাংশও আদালতের এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে। তাদের মতে, শুধু অপরাধীকে সাজা দিলেই তদন্ত শেষ হয় না। পুরো ঘটনার পেছনের সম্ভাব্য যোগসূত্র এবং প্রশাসনিক দায়ও সামনে আসা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে আর জি কর কাণ্ডে নতুন করে তদন্ত শুরু হওয়ার পর ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহল। এখন নজর, হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত বিশেষ তদন্ত দল নতুন করে কী তথ্য সামনে আনে।



