ইরানে নতুন করে সামরিক হামলা চালানোর বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছুই জানতেন না বলে দাবি করেছেন কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্মকর্তারা। অথচ এর আগের দিনই ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, এই তিন দেশের নেতারাই তাকে ব্যক্তিগতভাবে ইরানে নতুন সামরিক হামলা চালানো থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন।
সোমবার ট্রাম্প ঘোষণা করেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতারা কূটনীতিকে আরেকটি সুযোগ দিতে চাওয়ায় তিনি ইরানের বিরুদ্ধে একটি সামরিক অভিযান ‘স্থগিত’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ওই নেতারা তাকে জানিয়েছেন যে ‘বর্তমানে গুরুতর আলোচনা চলছে’ এবং মঙ্গলবারের জন্য নির্ধারিত ওই হামলা নিয়ে ওয়াশিংটনকে যেন আর অগ্রসর না হতে অনুরোধ করেন। তবে কিছু উপসাগরীয় দেশের কর্মকর্তা দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-কে বলেছেন, এই ধরণের কোনও আসন্ন সামরিক পরিকল্পনার বিষয়ে তাদের কিছুই জানা ছিল না।
মঙ্গলবারের মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান কূটনীতি থেকে আবারও যুদ্ধের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়তে দেখা যায়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্পের উপদেষ্টা এবং মিত্ররা যুক্তি দেখান যে, সীমিত পরিসরে একটি হামলা তেহরানকে শেষ পর্যন্ত চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য করতে পারে। এরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের অনুমোদন দেওয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েন।
আপাতত পিছু হটলেও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা যে এখনও পুরোপুরি বিদ্যমান, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, ওয়াশিংটন আরেকটি হামলার কতটা কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। ট্রাম্প জানান, হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি চূড়ান্ত অনুমোদনের ঠিক ‘এক ঘণ্টা দূরে’ ছিলেন।
তিনি সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাকে একেবারেই উড়িয়ে দেননি। উল্টো সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা কোনও চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানে হামলা চালাতে পারে। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি বলতে চাচ্ছি, আমি দুই বা তিন দিন, হতে পারে শুক্রবার, শনিবার, রবিবার বা এমন কিছু, অথবা আগামী সপ্তাহের শুরুর দিকের কথা বলছি।’
যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দিতে পারে না বলে তিনি আবারও পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের নেতারা এখন একটি চুক্তির জন্য ‘মিনতি’ করছেন।
চলমান এই সংকটে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এমন মিশ্র বার্তা নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিন তিনি কূটনীতির ইঙ্গিত দেন, তো পরের দিনই আবার হামলার হুমকি দেন। মাত্র কয়েক দিন আগেই তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, আলোচনা ব্যর্থ হলে ‘তাদের (ইরানের) আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না’।
ওয়াশিংটন যখন আলোচনার টেবিলে সামরিক চাপ বজায় রেখেছে, তখন তেহরান আবারও পরোক্ষ আলোচনার মাধ্যমে কূটনৈতিক পথ সচল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। মঙ্গলবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, শান্তি মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে তেহরান ১৪ দফার একটি নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এই প্রস্তাবে লেবাননসহ পুরো অঞ্চলজুড়ে সংঘাতের অবসান, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত করা এবং ইরানের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদী আরও বলেছেন, ইরান মার্কিন নৌ-অবরোধের অবসান এবং যুদ্ধে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ চায়।
তবে এই প্রস্তাব ওয়াশিংটনের অবস্থানে কোনও পরিবর্তন আনতে পেরেছে বলে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-কে এক শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হোয়াইট হাউস মনে করে এই প্রস্তাবে অর্থবহ কোনও উন্নতি নেই এবং এটি অপর্যাপ্ত। ইরানের এই সর্বশেষ প্রস্তাবটি আগের প্রস্তাবগুলোর মতোই, যেগুলোকে ট্রাম্প ইতোমধ্যে ‘আবর্জনা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই অচলাবস্থা যত দীর্ঘ হচ্ছে, উপসাগরীয় দেশগুলো দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মাঝে তত বেশি আটকা পড়ছে। প্রায় তিন মাস ধরে চলা এই সংকট ইতোমধ্যে ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। ড্রোন হামলা চালিয়ে এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তেহরান আমেরিকার উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। এর জবাবে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাদের নিজস্ব অবকাঠামোতে হামলার শিকার হওয়ার পর ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ত লক্ষ্যবস্তুগুলোতে গোপন হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে।



