উত্তর কোরিয়ায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিষয়টি নতুন কিছু নয়। দেশটির জনগণের মনে ভয় জিইয়ে রাখতে দীর্ঘ সময় ধরে একে অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে শাসকগোষ্ঠী। তবে সম্প্রতি কঠোর পাহারার এই দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে এক বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। করোনা মহামারি পরবর্তী সময়ে সাধারণ সহিংস অপরাধের চেয়ে বাইরের দুনিয়ার তথ্য জানা, ধর্মচর্চা ও রাজনৈতিক ভিন্নমতের কারণে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার হার নাটকীয়ভাবে বেড়েছে।
টিজেডব্লিউজির প্রতিবেদন
উত্তর কোরিয়ায় মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে কাজ করা সিউলভিত্তিক সংস্থা ট্রানজিশনাল জাস্টিস ওয়ার্কিং গ্রুপ (টিজেডব্লিউজি)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে কিম জং উনের শাসনামলে মৃত্যুদণ্ডের এই নতুন প্রবণতা উঠে এসেছে। কিম জং উনের আমলে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ১৪৪টি মামলা বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ১৩৬টি নিশ্চিত ঘটনায় ৩৫৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, এটি কেবল নিশ্চিত হওয়া সর্বনিম্ন সংখ্যা; প্রকৃত সংখ্যাটি আরও অনেক বেশি হতে পারে।
কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে পরিবর্তন
প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে উত্তর কোরিয়ার কিম জং উন সরকার এখন সাধারণ অপরাধীদের নিয়ে চিন্তিত নয়। তারা মূলত ভয় পাচ্ছে দেশটির মানুষের বাইরের বিশ্ব সম্পর্কে জানার প্রক্রিয়াটিকে। উত্তর কোরিয়ার সাধারণ মানুষ যখন বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে নিজেদের জীবনের তুলনা করতে শুরু করবে এবং একটি ভিন্ন জীবনের কল্পনা করবে, সেটিই এখন কিম প্রশাসনের সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ।
গত ১৯-২৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নবম পার্টি কংগ্রেসের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র, রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা এবং আমেরিকা-বিরোধী সংহতির এক শক্তিশালী রূপ প্রদর্শন করেছে। তবে বাহ্যিক এই শক্তির আড়ালে দেশের ভেতরে তারা চরম দুর্বলতা লুকাতে ব্যস্ত। সামান্য একটি দক্ষিণ কোরীয় নাটক দেখা, বিদেশি গান শোনা, ধর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া কিংবা সামান্য রাজনৈতিক অসন্তোষ প্রকাশের জন্যও নাগরিকদের দেওয়া হচ্ছে সর্বোচ্চ শাস্তি।
সীমান্ত বন্ধের প্রভাব
কোভিড-১৯ উত্তর কোরিয়ার জন্য কেবল একটি স্বাস্থ্য সংকট ছিল না। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে সীমান্ত সিল বা বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে দেশটির সরকার মূলত মানুষ, পণ্য ও তথ্যের প্রবাহ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। মহামারি নিয়ন্ত্রণের নামে সীমান্ত বন্ধের এই সুযোগটিকে আসলে জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে প্রশাসন।
টিজেডব্লিউজি-এর প্রতিবেদনে সীমান্ত বন্ধের আগের ও পরের সমপরিমাণ ১ হাজার ৭৮৩ দিনের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ফলাফলটি বেশ চমকপ্রদ। সীমান্ত বন্ধের আগে যেখানে মৃত্যুদণ্ডের মামলা ছিল ৩০টি, পরে তা ১১৬.৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫টিতে। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ব্যক্তির সংখ্যা ৪৪ থেকে ২৪৭.৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৩ জনে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে করোনার সুযোগ নিয়ে দেশটির শাসনকাঠামোকে আরও বেশি নিষ্ঠুর ও দমনমূলকভাবে ঢেলে সাজানো হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডের কারণ পরিবর্তন
সীমান্ত বন্ধের আগে উত্তর কোরিয়ায় মৃত্যুদণ্ডের সবচেয়ে সাধারণ কারণ ছিল ‘খুন’ বা হত্যার ঘটনা। তবে করোনা পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্র, নাটক, সংগীতসহ বাইরের সংস্কৃতি ও তথ্য আদান-প্রদান এবং ধর্ম ও তথাকথিত ‘কুসংস্কার’ চর্চা মৃত্যুদণ্ডের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাইরের সংস্কৃতি, তথ্য ও ধর্মচর্চার কারণে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনা আগে যেখানে ছিল মাত্র ৪টি, পরে তা ২৫০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪টিতে। এই অপরাধে জড়িত ব্যক্তির সংখ্যা ৭ থেকে ৪৪২.৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ জনে। বিপরীতে, খুনের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার ঘটনা ৯টি থেকে কমে ৫টিতে নেমে এসেছে।
এর অর্থ হলো, উত্তর কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ এখন দক্ষিণ কোরিয়ার নাটক বা বিদেশি সংগীতকে কেবল নিষিদ্ধ কনটেন্ট হিসেবে দেখছে না; বরং একে তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থায়িত্বের জন্য এক বড় হুমকি মনে করছে।
রাজনৈতিক কারণে মৃত্যুদণ্ড
এর পাশাপাশি রাজনৈতিক কারণে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার হারও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। কিম জং উনের নির্দেশনা অমান্য করা, কিম নিজে, দল (পার্টি) কিংবা দেশের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা স্টেট ইনফরমেশন ব্যুরো’র সমালোচনা করার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনা ৪টি থেকে ২২৫ শতাংশ বেড়ে ১৩টি হয়েছে। এই ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ব্যক্তির সংখ্যা ৪ থেকে ৬০০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ জনে।
মৃত্যুদণ্ডের ধরণ
উত্তর কোরিয়ায় মৃত্যুদণ্ড কেবল অপরাধীকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া নয়, এটি মূলত জনগণকে ভয় দেখানোর এক রাষ্ট্রীয় পারফর্ম্যান্স। তবে বর্তমানে দৃশ্যমান লাঠিয়াল নীতির পাশাপাশি গোপনীয়তার কৌশলও নিচ্ছে পিয়ংইয়ং।
প্রতিবেদনে ১২৯টি মৃত্যুদণ্ডের ধরণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জনসমক্ষে গণ-মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে ৬৬টি (৫১.১ শতাংশ), নির্দিষ্ট কোনও গোষ্ঠীর সামনে চালানো হয়েছে ২৮টি (২১.৭ শতাংশ), সম্পূর্ণ গোপনে করা হয়েছে ২৯টি (২২.৫ শতাংশ) এবং সংক্ষিপ্ত বা দ্রুত বিচারিক মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে ৬টি (৪.৭ শতাংশ)। সংবেদনশীল ও রাজনৈতিক ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মহলের নজরদারি এড়াতে সাধারণত সম্পূর্ণ গোপনে সম্পন্ন করা হয়।
দমনপীড়নের বিস্তার
অতীতে উত্তর কোরিয়ার এই দমনপীড়ন মূলত চীন সীমান্তবর্তী রিয়াংগ্যাং এবং উত্তর হামগিয়ং প্রদেশের মতো চোরাচালান ও তথ্য প্রবেশের রুটগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকত। তবে কোভিড-১৯ এর পর তা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। আগে যেখানে মাত্র ৮টি অঞ্চলে মৃত্যুদণ্ডের তথ্য মিলত, এখন তা রাজধানী পিয়ংইয়ং, নাম্পো, কায়েসং ও রাসনের মতো বিশেষ শহরসহ দেশের মোট ১৯টি অঞ্চলে বা আটটি প্রদেশেই নথিবদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ, কিম প্রশাসন এখন বাইরের তথ্যের অনুপ্রবেশকে কেবল সীমান্ত সমস্যা নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার জন্য একটি জাতীয় হুমকি হিসেবে দেখছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিম জং উন প্রশাসন কী ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে, শুধু তা দেখলেই চলবে না; বরং তারা নিজেদের দেশের মানুষকে কোন কাজগুলো করতে নিষেধ করছে, কী নিয়ে ভয় পাচ্ছে এবং কীভাবে মুখ বন্ধ রাখছে, সেটির দিকেও বিশ্ব সম্প্রদায়ের কড়া নজর রাখা উচিত।
দ্য ডিপ্লোম্যাট অবলম্বনে।



