বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ভারতকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পার্শ্ববর্তী দেশ আমাদের প্রতিবেশী। আমরা তাদের সম্মান করি এবং চাই তারা শান্তিতে থাকুক। তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেখানে মুসলিম নামের মানুষদের নাজেহাল করা হচ্ছে এবং বাংলাদেশের দিকে লাল চোখ দেখানো হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘এটা তিতুমীরের বাংলাদেশ, হাজি শরীয়তউল্লাহর বাংলাদেশ, শাহমখদুমের বাংলাদেশ। এ বাংলাদেশের দিকে চোখ রাঙাবেন না, হুমকি-ধমকি দেবেন না।’
শান্তি বজায় রাখার আহ্বান
শনিবার (১৬ মে) বিকালে ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে ১১ দলের রাজশাহী বিভাগীয় সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘আমরা চাই শান্তিতে থাকি, আপনিও শান্তিতে থাকুন। আমাদের শান্তি নিয়ে টান দিলে কারো শান্তিই থাকবে না।’ তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সেখানে যে মানবিক বিপর্যয় চলছে, সে ব্যাপারে আপনাদের বক্তব্য ও পদক্ষেপ জানতে চাই। এই বিপর্যয় বন্ধ হোক।’
সাম্প্রদায়িক অশান্তি প্রতিরোধ
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে কাউকে সাম্প্রদায়িক অশান্তি তৈরি করতে দেব না। এ দেশ সব ধর্মের মানুষের। আমাদের দিকে কেউ কালো হাত না বাড়াক। যদি দেয়, ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত তা রুখে দেবে।’
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি
জামায়াত আমির বলেন, ‘কারো রক্তচক্ষুর দিকে না তাকিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।’ তিনি উল্লেখ করেন, পদ্মা ও তিস্তার কারণে বাংলাদেশের এক-চতুর্থাংশ প্রায় মরুভূমি হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের প্রথম সরকার ফারাক্কা বাঁধ পরীক্ষামূলকভাবে ১৫ দিন চালানোর সুযোগ দিলেও ৫৫ বছরেও তা শেষ হয়নি। ফলে পদ্মা শুষ্ক মৌসুমে মরুভূমি ও বর্ষায় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পদ্মা ব্যারেজের ঘোষণা বাস্তবায়নের আহ্বান
ক্ষমতাসীন সরকারের পদ্মা ব্যারেজের ঘোষণাকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই ঘোষণা যেন লোক দেখানো না হয়, বাস্তবে রূপ নেয়। তিস্তা মহাপরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পদ্মার পানি আনতে হবে, এটি আমাদের ন্যায্য পাওনা। বাংলাদেশের ১৫৪টি অভিন্ন নদী আজ মৃতপ্রায়। খাল কেটে পানি দিতে চাইলে নদী ঠিক না থাকলে তা সম্ভব নয়।’
বিএনপির কঠোর সমালোচনা
বিএনপির সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘যে পথ দিয়ে স্বৈরাচার হেঁটেছিল, একই পথে আপনারা হাঁটছেন। স্বৈরাচারের পরিণতি অতীতে হয়েছিল, আপনাদেরও ভিন্ন হবে না।’ তিনি বলেন, ‘এ সংসদের মেয়াদ মাত্র আড়াই মাস। আমরা সুযোগ দিতে চেয়েছি আপনারা ভুল সংশোধন করুন। আমাদের উদারতা দুর্বলতা মনে করবেন না। ভালো কাজ করলে আমরা পানির মতো তরল, মন্দ কাজ করলে ইস্পাতের চেয়ে কঠিন।’
জুলাইযোদ্ধাদের উপহাসের প্রতিবাদ
জুলাইযোদ্ধাদের উপহাসের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন করেছি। যেদিন তরুণ-তরুণীরা সামনে এসেছিল, জনগণ সাড়া দিয়েছিল। এখন তাদের শিশু পার্টি বা গুপ্ত বলে উপহাস করা লজ্জার। যাদের কারণে আপনাদের এই গদি, তাদের উপহাস করছেন?’
গণভোটের রায় অগ্রাহ্যের সমালোচনা
গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গণভোটের রায় অগ্রাহ্য করা মানে জনগণকে অপমান করা। জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কেউ রেহাই পায়নি। আপনারা সৎপথে ফিরে আসুন, জাতির সঙ্গে গাদ্দারি করবেন না। যদি না করেন, তাহলে এর পাওনা বুঝে নেওয়ার জন্য তৈরি হোন।’
সংস্কার প্রস্তাবে গাদ্দারির অভিযোগ
সংস্কার প্রস্তাব প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আপনারা সংস্কারের প্রবক্তা, কিন্তু প্রথম দফায় আপনারা গাদ্দারি করছেন। ইশতেহারে বলেছিলেন অনির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকবে না, কিন্তু ৪২ জেলায় প্রশাসক নিয়োগ করেছেন। প্রশাসক কি নির্বাচিত?’
ভয় দেখানোর প্রতিবাদ
সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের ভয় দেখাবেন না। যাদের নেতারা হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়াতে পারেন, তাদের ভয় দেখানো সম্ভব নয়। আমরা জনগণের মুক্তির পথে চলব। সংসদে কথা বলতে না দিলে জনগণের পার্লামেন্টে আসব।’
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও রাজশাহী অঞ্চলের পরিচালক রফিকুল ইসলাম খান। পরিচালনা করেন রাজশাহী মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মন্ডল। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, জাতীয় নারীশক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিন প্রমুখ।



