বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বৃহস্পতিবার বিশ্বের দুই প্রভাবশালী শক্তিধর দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের বৈঠকটি মূলত রুদ্ধদ্বার কক্ষেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবুও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের এই শীর্ষ সম্মেলনের প্রথম দিনটি দুই নেতার ব্যক্তিগত নেতৃত্বদানের পদ্ধতি, তাদের লক্ষ্য এবং বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সামলানোর ধরন সম্পর্কে বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য সামনে এনেছে।
রাজকীয় অভ্যর্থনা
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এক বিশাল কুচকাওয়াজের মাধ্যমে স্বাগত জানান। সেখানে চীনা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি ছিল একদল উল্লাসিত শিশু-কিশোর। তাদের কারও হাতে ছিল ফুলের তোড়া, কারও হাতে আমেরিকার পতাকা। এক পর্যায়ে ট্রাম্প দাঁড়িয়ে শিশুদের উদ্দেশে তালি দেন। এই অভ্যর্থনায় অভিভূত ট্রাম্প বলেন, 'এমন সম্মান আমি খুব কমই দেখেছি। বিশেষ করে এই শিশুরা আমাকে মুগ্ধ করেছে। তারা খুবই হাসিখুশি ও সুন্দর ছিল। সামরিক কুচকাওয়াজ তো অবশ্যই চমৎকার ছিল, এর চেয়ে ভালো আর হতে পারত না। তবে এই শিশুরা ছিল সত্যিই অসাধারণ।'
ব্যক্তিত্ব ও বাচনভঙ্গির সংঘাত
দুই নেতার উদ্বোধনী বক্তব্যেই তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা ফুটে ওঠে। শি জিনপিং যেখানে বৈশ্বিক মঞ্চে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রায় দার্শনিক স্বরে কথা বলেছেন, সেখানে ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ তোষামোদ ও অতিরঞ্জিত বাচনভঙ্গি ব্যবহার করেছেন। চীনা ভাষায় দেওয়া বক্তব্যে শি জিনপিং 'থুসিডাইডিস ট্র্যাপ' সম্পর্কে সতর্ক করে দেন। প্রাচীন গ্রিসের এথেন্স ও স্পার্টার মধ্যকার চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে এই ধারণার উৎপত্তি, যেখানে একটি প্রতিষ্ঠিত বিশ্বশক্তি ক্রমবর্ধমান শক্তির উত্থানে ভীত হয়ে সংঘাতের পথে হাঁটে। শি জিনপিং ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রকে সেই প্রাচীন গ্রিসের যুদ্ধংদেহী মানসিকতা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, 'আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে যখন শতাব্দীর সবচেয়ে বড় রূপান্তর ত্বরান্বিত হচ্ছে, তখন বিশ্ব আজ এক নতুন সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কি থুসিডাইডিস ট্র্যাপ কাটিয়ে উঠে বড় শক্তিগুলোর সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে?'
অন্যদিকে ট্রাম্প তার বক্তব্যে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার দীর্ঘ সম্পর্কের কথা ফলাও করে প্রচার করেন এবং বড় বড় ব্যবসায়ী নেতাদের এই সফরে আনতে পারার কৃতিত্ব দাবি করেন। ট্রাম্প বলেন, 'অনেকেই বলছেন এটি সম্ভবত সর্বকালের সেরা শীর্ষ সম্মেলন। এমন কিছু আগে কেউ কখনও দেখেনি।'
তাইওয়ান নিয়ে চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি
পর্যবেক্ষকদের নজর ছিল তাইওয়ান ইস্যুতে দুই নেতার অবস্থানের দিকে। শি জিনপিং স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাইওয়ানের পক্ষ নেয়, তবে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়বে। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া এই বৈঠকের একটি বিবরণ প্রকাশ করেছে। সেখানে শি জিনপিংকে সতর্ক করে বলতে শোনা যায়, 'যদি বিষয়টি ভালোভাবে সামলানো যায়, তবে দুই দেশ স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারবে। আর যদি ভুলভাবে সামলানো হয়, তবে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ বা বড় কোনো সংঘাত বেঁধে যাবে, যা পুরো মার্কিন-চীন সম্পর্ককে এক অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে।' তবে তাইওয়ান নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প তখন কোনো মন্তব্য করেননি।
বড় চুক্তির সন্ধানে
ট্রাম্পের এই সফরে তার সঙ্গী হয়েছেন আমেরিকার শীর্ষ ধনী ব্যবসায়ীরা। তাদের মধ্যে অ্যাপলের টিম কুক, টেসলার ইলন মাস্ক এবং এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং অন্যতম। ট্রাম্প দাবি করেন যে ৩০ জন ব্যবসায়ী নেতা এই সফরে অংশ নিচ্ছেন, যদিও গ্রেট হলে তার সঙ্গে মাত্র ১৪ জনকে দেখা গেছে। চীনা নেতার উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, 'আমরা বিশ্বের শীর্ষ ৩০ জনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। প্রত্যেকেই রাজি হয়েছেন। আমি কোনো কোম্পানির দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রধানকে চাইনি, শুধু শীর্ষ ব্যক্তিদের চেয়েছি। তারা আজ এখানে এসেছেন আপনাকে এবং চীনকে সম্মান জানাতে। তারা চমৎকার বাণিজ্যের অপেক্ষায় আছেন।'
বিতর্কে ট্রাম্প অর্গানাইজেশন
ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে একজনকে গ্রেট হলে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে করমর্দন করতে দেখা গেছে, যিনি প্রেসিডেন্টের পুত্র এরিক ট্রাম্প। বর্তমানে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে থাকায় এরিকই পারিবারিক ব্যবসা সামলাচ্ছেন। প্রেসিডেন্টের দাফতরিক কাজে পরিবারের ব্যবসায়ী স্বার্থের কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, এরিকের উপস্থিতি সেই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তবে ট্রাম্প অর্গানাইজেশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এরিক কেবল তার পিতাকে সমর্থন দিতে ব্যক্তিগতভাবে এই সফরে এসেছেন এবং চীনে তার ব্যবসার কোনো পরিকল্পনা নেই। বিবৃতিতে বলা হয়, 'এরিক একজন সমর্থনকারী পুত্র হিসেবে ব্যক্তিগত ক্ষমতায় এখানে এসেছেন। চীনে তার কোনো ব্যবসা নেই এবং করার পরিকল্পনাও নেই।'



