আদমজী জুট মিল বন্ধের ২৪ বছর: পাটকল থেকে ইপিজেডে রূপান্তর, ক্ষতির চেয়ে লাভ বেশি
আদমজী জুট মিল বন্ধের ২৪ বছর: পাটকল থেকে ইপিজেডে রূপান্তর

আজ (৩০ জুন, ২০২৬) আদমজী জুট মিল বন্ধের ২৪তম বছর। ২০০২ সালের এই দিনে এশিয়ার বৃহত্তম জুট মিল আদমজীকে তৎকালীন বিএনপি জোট সরকার চিরতরে বন্ধ করে দেয়। ফলে মিলটির ৩৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ৬ মার্চে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আদমজী ইপিজেডের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সেই থেকে আদমজী ইপিজেডের অগ্রযাত্রা শুরু হয়, যা ক্ষতির চাইতে লাভের পাল্লা ভারি বলে মনে করছেন এলাকার ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকরা।

অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও বিনিয়োগ

আদমজী ইপিজেডে এ পর্যন্ত বিনিয়োগের পরিমাণ ৮৪০ দশমিক ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ১০ হাজার ৯৩৪ দশমিক ৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে। বর্তমানে ইপিজেডে ৭৫ হাজার ৯৫৯ জন শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন। দিন দিন বাড়ছে কর্মসংস্থান ও শ্রমিকের সংখ্যা, সমৃদ্ধি আসছে এলাকার অর্থনীতিতে।

আদমজী জুট মিল বন্ধের সময় বাম রাজনৈতিক দলগুলোসহ কিছু সুবিধাভোগী সংগঠন এর বিরোধিতা করে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিল। কিন্তু বছরের পর বছর লোকসান, উৎপাদন দক্ষতার অবনতি এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা শ্রমিক সংগঠনগুলোর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কারণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মিলটি বন্ধ করে দেন। এরপর তিনি একই জায়গায় আদমজী ইপিজেড প্রতিষ্ঠা করেন, যা রাষ্ট্র ও এলাকার অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অবকাঠামো ও অবস্থানগত সুবিধা

রাজধানী ঢাকার জিরো পয়েন্ট থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার পূর্বে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজীনগরে আদমজী ইপিজেডের অবস্থান। ২৯২ দশমিক ৬২ একর জমির উপর স্থাপিত এই ইপিজেডে বর্তমানে শিল্প প্লটের সংখ্যা ২৭৬টি। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিকল্পিত ইপিজেড স্থাপন ও দক্ষ জনশক্তি এর সাফল্যের মূল কারণ। সড়ক, নৌ ও আকাশপথের সুবিধাজনক অবস্থান; উড়াল সেতুর কারণে ঢাকার সঙ্গে সহজ যোগাযোগ; এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক কাঁচপুর ব্রিজ পর্যন্ত আটলেন ও তারপর ফোরলেন হওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পোশাক আমদানি-রপ্তানি সহজতর হয়েছে।

আদমজী ইপিজেডের সর্বমোট ২৭৬টি শিল্প প্লটের মধ্যে বর্তমানে ৫০টি শিল্প প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে রয়েছে। এখানে রেমি হোল্ডিংস লিমিটেডের মতো বিশ্বের শীর্ষ পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানাও অবস্থিত।

স্থানীয় প্রতিনিধির মতামত

সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও নাসিক কাউন্সিলর ব্যবসায়ী মো. ইকবাল হোসেন বলেন, “বছরের পর বছর লোকসান হওয়ায় আদমজী জুট মিল বন্ধ করে দিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এরপর তিনি একই জায়গায় আদমজী ইপিজেড প্রতিষ্ঠা করেন। এতে বাংলাদেশের পাশাপাশি এলাকার বিপুল সংখ্যক জনসংখ্যা কর্মসংস্থান পেয়েছে। এই ইপিজেডের কারণে বিভিন্ন দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে আসছে, আমাদের রপ্তানি খাত চাঙ্গা হচ্ছে এবং আমরা বিদেশি মুদ্রা আয় করতে পারছি। বেগম খালেদা জিয়া জুট মিল থেকে ইপিজেড প্রতিষ্ঠা করায় ক্ষতির চাইতে লাভের হিসাবটাই বেশি হয়েছে।”

উৎপাদিত পণ্য ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ

বর্তমানে আদমজী ইপিজেডে গার্মেন্টস, গার্মেন্টস এক্সেসরিজ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, গাড়ির সিট ট্রিম কভার, লেবেল, সোয়েটার, মেটাল পণ্য, জুয়েলারি, ওপিসি ড্রাম, কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্টিলাইজার, নিটিং অ্যান্ড টেক্সটাইল পণ্য ইত্যাদি উৎপাদিত হয়। স্বাগতিক বাংলাদেশসহ যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, জাপান, মরিশাস, সিঙ্গাপুর, চীন, কানাডা, স্পেন, জার্মানি, হংকং (চীন), মালয়েশিয়া, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র, কুয়েত, ইউক্রেন ও রোমানিয়ার বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগ করেছে।

চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, আদমজী ইপিজেডের প্রধান সড়ক (শিমরাইল-আদমজী ইপিজেড-নারায়ণগঞ্জ সড়ক) অত্যন্ত সংকীর্ণ। এতে অধিকাংশ সময় যানজট লেগে থাকায় শ্রমিকদের দুর্ভোগের পাশাপাশি অনেক কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। তাছাড়া ডিএনডি খালের উপর নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের অপরিকল্পিত সেতু নির্মাণের ফলে শ্রমিকদের দুর্ভোগ বাড়ছে। তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দৃষ্টি কামনা করে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানান।