আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ছয়টি মামলার রায়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ৬১ আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ১১ জন পলাতক এবং চারজন কারাগারে বন্দী। এছাড়া যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ৪৬ আসামিকে, যার মধ্যে ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলামসহ ১১ জন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত।
ছয় মামলায় রায়ের বিবরণ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১৪ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। বিচার কার্যক্রম গতিশীল করতে ২০২৫ সালের ৮ মে আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। গত ১৮ মাসে জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধ সংক্রান্ত ছয়টি রায় এসেছে। প্রথম রায় ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর এবং সর্বশেষ রায় ৩০ জুন। ছয় রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত ৬১ আসামির মধ্যে ৪০ জন পলাতক এবং ২১ জন কারাগারে।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, “কিছু রায়ে আমরা সন্তুষ্ট, আবার কিছু রায়ে অসন্তুষ্ট। যেসব আসামির সাজা সন্তোষজনক ছিল না, সেসব ক্ষেত্রে আপিল করেছে প্রসিকিউশন। জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার দ্রুত এগোচ্ছে। একটি মামলা রায়ের অপেক্ষায় আছে, আরও দু-তিনটি মামলার বিচার শেষ পর্যায়ে।”
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা
ছয় মামলার পাঁচটিতে ১৫ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রাজনীতিবিদ চারজন: ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান, সাভারের সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ও আশুলিয়ার যুবলীগ নেতা রনি ভূঁইয়া। চারজনই পলাতক। বাকি ১১ জন পুলিশের সাবেক সদস্য, যাদের মধ্যে সাতজন পলাতক এবং চারজন কারাগারে।
প্রথম রায়ে (১৭ নভেম্বর ২০২৫) শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল-১। দ্বিতীয় রায়ে (২৬ জানুয়ারি ২০২৬) চানখাঁরপুলে ছয়জন হত্যার দায়ে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, তিনজনই পলাতক। তৃতীয় রায়ে (৫ ফেব্রুয়ারি) আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানো মামলায় ছয়জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, যার মধ্যে আবদুল মালেক ও মুকুল চোকদার কারাগারে, বাকি চারজন পলাতক। চতুর্থ রায়ে (৯ এপ্রিল) আবু সাঈদ হত্যা মামলায় পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড, দুজনই কারাগারে। পঞ্চম রায়ে (২৮ জুন) রামপুরা বনশ্রী এলাকার মামলায় হাবিবুর রহমানসহ তিনজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, তিনজনই পলাতক। ষষ্ঠ রায়ে (৩০ জুন) জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড।
যাবজ্জীবন ও অন্যান্য সাজা
তিনটি মামলায় ১১ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সবাই পুলিশের সাবেক সদস্য। আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলায় সাতজন যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত: ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক এসপি আসাদুজ্জামান রিপন, সাবেক অতিরিক্ত এসপি আবদুল্লাহিল কাফী, সাবেক অতিরিক্ত এসপি শহিদুল ইসলাম, সাবেক পরিদর্শক মাসুদুর রহমান, নির্মল কুমার দাস ও আরাফাত হোসেন। আবদুল্লাহিল, শহিদুল ও আরাফাত কারাগারে, বাকি চারজন পলাতক। আবু সাঈদ হত্যা মামলায় তিনজন যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত: সাবেক সহকারী কমিশনার আরিফুজ্জামান, পরিদর্শক রবিউল ইসলাম ও এসআই বিভূতিভূষণ রায়, তিনজনই পলাতক। রামপুরা মামলায় সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত, তিনিও পলাতক।
আবু সাঈদ হত্যা মামলায় রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদ, সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলামসহ ১২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সদস্যদের দণ্ড ও রাজসাক্ষী
ছয় মামলায় সবচেয়ে বেশি দণ্ড পেয়েছেন পুলিশের সাবেক সদস্যরা, মোট ৩৪ জন। এর মধ্যে ১১ জন মৃত্যুদণ্ড, ১১ জন যাবজ্জীবন এবং বাকিরা বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ১৫ জন কারাগারে এবং ১৯ জন পলাতক। পৃথক দুটি মামলায় রাজসাক্ষী হয়েছিলেন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ও সাবেক এসআই শেখ আবজালুল হক। মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং আবজালুলকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, “মামলা নিষ্পত্তির সঙ্গে আসামির রাজনৈতিক বা পেশাগত পরিচয়ের সম্পর্ক নেই। যাদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাদের সাজা হয়েছে।”
আদালত অবমাননা ও বিচারাধীন মামলা
আদালত অবমাননার দায়ে দুটি মামলায় রায় দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের ২ জুলাই শেখ হাসিনাকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অপর আসামি শাকিল আকন্দ বুলবুলকে দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল-১। ১২ এপ্রিল যুবলীগ নেতা এম এইচ পাটোয়ারীকে দুই মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ট্রাইব্যুনাল দুটিতে বর্তমানে ১৯টি মামলা বিচারাধীন, যার মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১-এ ১৫টি এবং ট্রাইব্যুনাল-২-এ চারটি। এসব মামলায় প্রায় ২০০ আসামি, যাদের মধ্যে রাজনীতিবিদ, সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যরা রয়েছেন। চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় জানিয়েছে, ছুটি শেষে জুলাইয়ের শেষে বা আগস্টে আরও তিন-চারটি মামলার রায় হতে পারে।
জুলাই শহীদ শাহরিয়ার হাসান আলভীর বাবা আবুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, “শেখ হাসিনার মতো যেসব ফাঁসির আসামি পলাতক, তাদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে রায় কার্যকর করতে হবে।”



