বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘আমি চীনের প্রাচীর দেখিনি, আবু সাঈদের বুক দেখেছি। চীনের প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে থেকে কীভাবে গুলি খেতে হয়, সেই দৃশ্য আমি দেখেছি।’
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘আলোয় স্মৃতি সমুজ্জ্বল’ কর্মসূচি
জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মাসব্যাপী ছাত্রদলের কর্মসূচির অংশ হিসেবে বুধবার (১ জুলাই) প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালন করা হয়। মঙ্গলবার (৩০ জুন) রাত ১১টা থেকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা ধাপে ধাপে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সমবেত হন।
রিজভীর আবেগঘন বক্তব্য
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রিজভী বলেন, ‘এই স্মৃতি তর্পণের অনুষ্ঠান আমরা মোমবাতির আলোয় করছি। এই আলো শুধু সাময়িক অন্ধকার দূর করবে না, এটি ভুবনভরা আলো। জুলাইয়ের স্মৃতি আমাদের আলোকিত করবে, প্রজ্জ্বলিত করবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নতুন সংগ্রামে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেবে।’
তিনি বলেন, ‘জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল শুভ সময়ে জন্ম নেয়নি। দীর্ঘ ১৭ বছর তারা লড়াই-সংগ্রাম করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেই ধারাবাহিক সংগ্রামের শ্রেষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ। এ জন্য জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’
আবেগঘন বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, ‘আমি চীনের প্রাচীর দেখিনি, আবু সাঈদের বুক দেখেছি। চীনের প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে থেকে কীভাবে গুলি খেতে হয়, সেই দৃশ্য আমি দেখেছি। আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু চট্টগ্রামের ওয়াসিম আকরামকে হিমালয়ের মতো বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে তপ্ত বুলেট বরণ করতে দেখেছি। আমি প্রশান্ত মহাসাগর দেখিনি, কিন্তু শহীদ আনাসের মায়ের চোখের জল দেখেছি। সেই অশ্রু দেখেই প্রশান্ত মহাসাগরের কথা মনে পড়ে।’
শহীদদের স্মৃতি চিরস্মরণীয়
রিজভী বলেন, ‘শহীদদের স্মৃতি শুধু একটি মাস বা একটি দিনের জন্য নয়। আমাদের সব জানালা খোলা রাখতে হবে। তারা আমাদের বিবেককে জাগ্রত রাখবে, যেন আর কোনো স্বৈরাচার, অগণতান্ত্রিক শক্তি বা ফ্যাসিবাদের উত্থান না ঘটে।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ পরাজিত হয়েছে, কিন্তু তার অবশিষ্টাংশ এখনো বিভিন্ন জায়গায় রয়ে গেছে। যারা দেশের টাকা লুট করেছে, তারা এখনো নানা জায়গায় ষড়যন্ত্র করছে। তাই ছাত্রসমাজকে সবসময় জাগ্রত থাকতে হবে। ইতিহাস বলে, ছাত্রসমাজ কখনো ঘুমায় না।’
ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করেন। জাতীয়তাবাদ মানে দেশ, দেশের মানুষ এবং গণতন্ত্রের জন্য অবিরাম সংগ্রাম। আপনাদের নেতা তারেক রহমানের চিন্তা-চেতনায়ও সেই জাতীয়তাবাদ প্রতিফলিত হয়েছে। তাই দেশের স্বার্থে আপনাদের সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে।’
ছাত্রদল সভাপতি ও সাংগঠনিক সম্পাদকের বক্তব্য
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ‘হাজারের বেশি ছাত্র-জনতা এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ১৪২ জন নেতাকর্মী ও সমর্থক জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছেন। তাদের স্মরণেই আমরা প্রতিবছর ‘আলোয় স্মৃতি সমুজ্জ্বল’ কর্মসূচি পালন করছি এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখব।’
তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশে যারা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রক্ত দিয়েছেন, আমরা তাদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। তাদের আত্মত্যাগ কখনো ভুলে যাওয়া হবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় ছাত্রদল অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করবে।’
ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি রক্ত দিয়েছে এবং সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। দীর্ঘ ১৭ বছর নিপীড়ন সহ্য করার পরও আমরা দেশের প্রশ্নে কখনো আপস করিনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘জুলাইকে কোনো ব্যবসার উপকরণ হতে দেওয়া হবে না। এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। বাংলাদেশ চলবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার ও সুশাসনের ভিত্তিতে; কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া ‘জুলাইয়ের চেতনা’র ভিত্তিতে নয়। সবার আগে বাংলাদেশ—এই নীতিই প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’



