অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাপানের সঙ্গে তৈরি হওয়া টানাপোড়েন কাটাতে উদ্যোগী হয়েছে বিএনপি সরকার। এ লক্ষ্যে জাপানের ঋণ সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেলের লাইন-১ ও লাইন-৫ প্রকল্পের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে আলোচনা অব্যাহত রাখতে সাত সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ বলেন, ‘সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হচ্ছে জাপানের অর্থায়নে মেট্রোরেল দুটি নির্মাণ হবে। তবে প্রকল্পের ব্যয় কমাতে জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার সঙ্গে আলোচনা চলছে। আশা করা যাচ্ছে, বিষয়টি সুরাহা হবে।’
বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের ভূমিকা
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী জাপান। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ৭ হাজার ৭২৮ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ১৮ শতাংশ ঋণ এসেছে জাপান থেকে। তুলনামূলক সহজ শর্তে জাপানি ঋণ পাওয়া যায়। জাইকার অর্থায়নে বাংলাদেশে মেট্রোরেল, মহেশখালীর মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং যমুনা নদীর ওপর রেলওয়ে সেতুসহ বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। তবে এসব প্রকল্পের মধ্যে কয়েকটির ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নতুন মেট্রোরেলের ব্যয় বৃদ্ধি
নতুন দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় বিদ্যমান প্রকল্পের তুলনায় অনেক বেশি। দর প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন দুই লাইনের প্রতি কিলোমিটার নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। বিপরীতে উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল (লাইন-৬) নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছিল ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি (ডিএমটিসিএল) এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখেছে, জমি অধিগ্রহণ ও জনবল ব্যয় বাদে ভারতে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় হয় ১৫০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকার মধ্যে।
২০১৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুমোদিত এমআরটি লাইন-১ (বিমানবন্দর-কমলাপুর ও নতুনবাজার-পূর্বাচল) এবং এমআরটি লাইন-৫ (হেমায়েতপুর-ভাটারা) প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল যথাক্রমে ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ও ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। পরে জাইকা বিস্তারিত সমীক্ষা শেষে লাইন-১-এর ব্যয় ৯৬ হাজার ৫০০ কোটি এবং লাইন-৫-এর ব্যয় ৮৮ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব দেয়। এতে প্রথম প্রকল্পের ব্যয় ৮৪ শতাংশ এবং দ্বিতীয়টির ব্যয় ১১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন ও স্থগিতাদেশ
উচ্চ ব্যয়ের দর প্রস্তাবের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল ডিএমটিসিএলের তৎকালীন প্রশাসন। তখন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন ফারুক আহমেদ, যার অস্ট্রেলিয়া, ভারত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও হংকংয়ে মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ডিএমটিসিএল ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি ‘অধিক পর্যালোচনার জন্য আপাতত স্থগিত রাখার’ নির্দেশনা দেয়। বিএনপি সরকার আসার পর ফারুক আহমেদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল হয়েছে।
সম্পর্কোন্নয়নে বৈঠক
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, মেট্রোরেলের খরচ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে জাপানের টানাপোড়েন কমাতে সচিবালয় ও সচিবালয়ের বাইরে অন্তত চারটি বৈঠক হয়েছে। মেট্রোরেল বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি, ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকীর সঙ্গে জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনইচির একটি, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব জিয়াউল হকের সঙ্গে জাইকার প্রতিনিধিদের একটি এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সঙ্গে জাইকার প্রতিনিধিদলের মধ্যে একটি বৈঠক হয়। সব দিক বিবেচনা করে প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া এবং আলোচনা করে ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত হয়।
অর্থমন্ত্রীর উদ্বেগ
অর্থ মন্ত্রণালয় ও ইআরডি সূত্র জানিয়েছে, মেট্রোরেল দুটির উচ্চ ব্যয় নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে প্রশ্ন ও উদ্বেগ রয়েছে। গত ২০ মে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এক বৈঠকে প্রকল্পগুলোর ‘অস্বাভাবিক’ ব্যয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় ব্যয় হ্রাসে দর-কষাকষি অব্যাহত রাখা এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক মানের পরামর্শক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়।
জাইকার যুক্তি
ডিএমটিসিএলের একটি সূত্র জানিয়েছে, জাইকার পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে যে, নতুন দুটি মেট্রোরেলের বড় অংশ মাটির নিচ দিয়ে যাবে। সে কারণে মেট্রোরেল-৬-এর চেয়ে খরচ বেশি। ডলার ও নির্মাণ উপকরণের মূল্যবৃদ্ধিও খরচ বাড়ার কারণ। চারটি বৈঠকে জাইকার পক্ষ থেকে উদাহরণ দেওয়া হয়, ২০১৯ সালে গাবতলী স্টেশনের যে নকশা করা হয়েছিল, এখন তা সংশোধন করতে হচ্ছে। তখন গাবতলী স্টেশনের দৈর্ঘ্য ৩০০ মিটার ছিল, এখন বাড়িয়ে ৬৫০ মিটার করা হচ্ছে। ভাটারা ও কচুক্ষেত স্টেশনের গভীরতাও বাড়ছে। শ্রমিকের ব্যয় বাড়ছে।
প্রতিযোগিতার অভাব
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জাপানি ঋণের শর্তাবলির কারণে অনেক ক্ষেত্রে অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ কম থাকে। যদিও মেট্রোরেল প্রকল্পে দরপত্র উন্মুক্তভাবে আহ্বান করা হয়, বাস্তবে দু-তিনটি নির্দিষ্ট কোম্পানিই বারবার অংশ নেয়। এতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা কমে যায়।
ইআরডি সচিবের বক্তব্য
দুটি মেট্রোরেলের বিষয়ে ২৩ মে ইআরডি সচিবের সঙ্গে জাপানের রাষ্ট্রদূতের বৈঠক হয়। ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী বলেন, ‘দুটি মেট্রোরেল নির্মাণে জাপানের সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনা চলছে। তবে একই সময়ে দুটি প্রকল্পের ব্যয় পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’
কারিগরি কমিটি গঠন
এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫ প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা যাচাইয়ের জন্য সাত সদস্যের কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর আহ্বায়ক করা হয়েছে এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এম শামীমুজ্জামান বসুনিয়াকে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে ২৪ মে জারি করা অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়। অধ্যাপক বসুনিয়া বলেন, ‘দুই মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির কারণগুলো খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি এই ব্যয় বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক, সেটিও মূল্যায়ন করা হবে।’



