জাতীয় সংসদ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীসহ অর্থবিল-২০২৬ পাস করেছে। সংশোধনীগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি এবং প্রস্তাবিত বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশ-সংক্রান্ত বিধান প্রত্যাহার। সোমবার (২৯ জুন) অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি উত্থাপন করলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে কণ্ঠভোটে তা পাস হয়।
করমুক্ত আয়ের সীমা পাঁচ বছরের জন্য নির্ধারণ
বাজেট আলোচনার সময় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী জাতীয় বাজেটের কয়েকটি প্রস্তাবে সংশোধনী আনেন। এর মধ্যে আগামী পাঁচ অর্থবছরের জন্য ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হয়েছে। সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ টাকা, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর আগে প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা যথাক্রমে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, ৪ লাখ টাকা এবং ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব ছিল।
বিনিয়োগ তথ্য প্রকাশের প্রস্তাব প্রত্যাহার
অর্থমন্ত্রী জানান, বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশ-সংক্রান্ত প্রস্তাবটিও প্রত্যাহার করা হয়েছে, কারণ এটি নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি বলেন, “প্রকৃতপক্ষে অনেক জমি প্রকৃত বাজারমূল্যের পরিবর্তে মৌজা মূল্যে নিবন্ধিত হওয়ায় করদাতাদের জটিলতা থেকে রক্ষা করতেই এ প্রস্তাব আনা হয়েছিল। তবে জনমতের প্রতি সম্মান জানিয়ে সরকার এটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।” জনসাধারণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ায় আরও দুটি প্রস্তাবও প্রত্যাহার করা হয়েছে। এগুলো হলো—বেশিরভাগ ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করা এবং বণ্টন দলিল ও নামজারি নিবন্ধনের জন্য টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করহার কমানো
অর্থমন্ত্রী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়কর হার বিদ্যমান ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন। তিনি পার্বত্য তিন জেলা ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য বিদ্যমান কর-সুবিধা আরও সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেন। এর ফলে ব্যবসা, কৃষি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আয়ের পাশাপাশি বেতন ভিত্তিক আয়ও করমুক্ত থাকবে।
চিংড়ি ও শিল্প খাতে শুল্ক ছাড়
চিংড়ি খাতকে সহায়তা দিতে আমদানি করা চিংড়ির খাদ্য, প্রোবায়োটিক, ভিটামিন, খনিজ, অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেন তিনি। দেশীয় শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি ওষুধ ও অন্যান্য উৎপাদন শিল্পে ব্যবহৃত আমদানি করা মধুর ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাবও দেন।
শিল্পে বহুল ব্যবহৃত পিভিসি ও পিইটি রেজিনের আমদানি শুল্ক প্রস্তাবিত ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়। এছাড়া ফায়ার ডোর তৈরিতে ব্যবহৃত কোল্ড-রোলড শিট, ফ্ল্যাট স্টিল পণ্যে ব্যবহৃত কোটেড ক্রোমিয়াম অক্সাইড এবং বৈদ্যুতিক কেবল উৎপাদনে ব্যবহৃত রিফাইন্ড কপার ওয়্যারের ওপর প্রস্তাবিত নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। আমদানি করা ফায়ার ব্রিকের ওপর প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও অগ্রিম কর বাতিলেরও প্রস্তাব দেন অর্থমন্ত্রী।
কাজুবাদাম ও এলইডি বাতি শিল্পে সহায়তা
দেশীয় কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাত শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করা অপরিশোধিত কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এলইডি বাতি এবং প্রিফ্যাব্রিকেটেড ভবন তৈরির কাঁচামাল আমদানির ওপর বিদ্যমান শুল্ক-সুবিধার মেয়াদ ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাবও করা হয়েছে।
ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে ভ্যাট কমানো
ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক অর্থপ্রদানের চ্যানেল ব্যবহারে উৎসাহ দিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সার্চ ইঞ্জিন, অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচারে বিদ্যমান ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এতে বিদেশে অনানুষ্ঠানিক অর্থপ্রদান কমবে এবং কর পরিপালন বাড়বে।
সোনা, গাড়ি ও মৎস্য খাতে ভ্যাট সুবিধা
এছাড়া সোনা, প্লাটিনাম ও হীরার গহনার ওপর ভ্যাট ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং রুপার গহনার ওপর ১০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগি চুক্তির ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি এবং সরবরাহকারী পর্যায়ে সব ধরনের মাছ সরবরাহে পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়েছে। দেশীয় মোটরগাড়ি শিল্পকে উৎসাহিত করতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডাবল কেবিন পিকআপ ও মাইক্রোবাসের ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর পরিপালন সহজ করতে নির্বাচিত কয়েকটি খাতে ভ্যাট ব্যবস্থার কো-ইফিশিয়েন্ট দাখিলের বাধ্যবাধকতাও শিথিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।



