ব্রেক্সিট গণভোটের ১০ বছর পূর্তি কেবল একটি প্রতীকী ঘটনা নয়; এর সঙ্গে যেন ইতিহাসের এক অদ্ভুত সমাপতনও জড়িয়ে গেল। যে গণভোট ব্রিটিশ রাজনীতিকে গভীর বিভাজনে ঠেলে দিয়েছিল, তার ১০ বছর পূর্তির মুহূর্তেই আরেকটি বড় রাজনৈতিক ঘটনা ঘটল। সেটি হলো যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ।
স্টারমারের বিদায় ও ব্যর্থতা
স্টারমার নিজের স্বভাবসিদ্ধ সংযম ও মর্যাদা বজায় রেখেই বিদায় নিলেন। কিন্তু তাঁর বিদায়ের পেছনে একটি স্পষ্ট ব্যর্থতার ছায়া রয়েছে। ব্রিটিশ অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করবেন বলে দুই বছর আগে তিনি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা তিনি বাস্তবায়িত করতে পারেননি। এই ব্যর্থতার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে আসা।
ব্রেক্সিটের অর্থনৈতিক ক্ষতি
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা বলছে, ব্রেক্সিটের ফলে গত এক দশকে যুক্তরাজ্যের মোট দেশজ উৎপাদনের ৬ থেকে ৮ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে। এই বিপুল ক্ষতির পর ব্রিটিশ জনমনে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবনা শুরু হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবে সরকারিভাবে বা রাজনৈতিক আলোচনায় এই পরিবর্তনের খুব একটা ছাপ চোখে পড়ে না। লন্ডন থেকে ব্রাসেলস—সব জায়গাতেই রাজনৈতিক নেতারা যেন পুরোনো অবস্থানেই আটকে রয়েছেন।
জনমতের পরিবর্তন
রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেখানে স্থির, সাধারণ মানুষের মনোভাব সেখানে অনেকটাই বদলে গেছে। বিশেষ করে ব্রিটেনে এই পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের একটি সমীক্ষা বলছে, ব্রিটিশ নাগরিকেরা এখন ব্রেক্সিট নিয়ে গভীরভাবে হতাশ। তাঁদের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অবৈধ অভিবাসন, নিরাপত্তাসংকটের মতো প্রধান সমস্যাগুলো ব্রেক্সিটের ফলে আরও বেড়েছে।
পোল্যান্ড থেকে পর্তুগাল—প্রায় সব দেশেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ চান ব্রিটেন আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরে আসুক। অনেকেই মনে করেন, এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইউরোপীয় কমিশনের কঠোর অবস্থান কিছুটা শিথিল করা উচিত, বিশেষ করে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে।
ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের আকাঙ্ক্ষা
সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ ইউরোপের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চান। এই ‘ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক’ বলতে তাঁরা কী বোঝান—এ প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি মানুষ বলেছেন, আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়া।
এ পরিবর্তনের একটি বড় কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের আবার ক্ষমতায় ফেরা। যুক্তরাষ্ট্রকে আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে দেখছেন না অনেক ব্রিটিশ নাগরিক। ফলে তাঁরা অর্থনীতি, নিরাপত্তা এমনকি সীমান্ত রক্ষার ক্ষেত্রেও ইউরোপের দিকে তাকাচ্ছেন।
ইউরোপের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন
ইউরোপীয় দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন এসেছে। ট্রাম্প, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং—এই তিন নেতার নীতিতে বিশ্বব্যবস্থায় যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা ইউরোপকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। এখন তাঁরা ব্রিটেনকে শাস্তি দেওয়ার বদলে ভাবছেন কীভাবে দুই পাড়ের মধ্যে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়, যা তাঁদের নিজস্ব নিরাপত্তার জন্যও জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র যদি পিছিয়ে যায় এবং চীন যদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ বাড়ায়, তাহলে ইউরোপকে নিজেদের রক্ষার পথ খুঁজতেই হবে।
এ প্রেক্ষাপটে পোল্যান্ড থেকে পর্তুগাল—প্রায় সব দেশেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ চান ব্রিটেন আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরে আসুক। অনেকেই মনে করেন, এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইউরোপীয় কমিশনের কঠোর অবস্থান কিছুটা শিথিল করা উচিত, বিশেষ করে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে।
নতুন সম্পর্কের আহ্বান
এই ১০ বছরে এসে তাই প্রয়োজন পুরোনো বিভাজন ভুলে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলা। ব্রেক্সিট যে রাজনৈতিক ফাটল তৈরি করেছিল, তা মেরামতের সময় এসেছে। এত সময় নষ্ট হয়েছে, অথচ লাভ কিছুই হয়নি। ইংলিশ চ্যানেলের দুই পাড়েই মানুষ এখন নতুন সম্পর্ক চান, যা আগামী ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর হবে।



