জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নাকি বিপ্লব? সাক্ষাৎকারে সৈয়দ নিজার
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নাকি বিপ্লব? সাক্ষাৎকারে সৈয়দ নিজার

সাক্ষাৎকারে সৈয়দ নিজার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে বিপ্লব নয়, অভ্যুত্থান হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তাঁর মতে, অভ্যুত্থান সব সময় শুরু হয় একটি ‘না’ বা অস্বীকারের মধ্য দিয়ে, যেখানে বিপ্লব শুরু হয় ‘হ্যাঁ’ বা একটি ইতিবাচক বিকল্প প্রস্তাবনার মাধ্যমে। তিনি ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বিপ্লবের দুটি ধরন উল্লেখ করেন: ফরাসি বিপ্লবের প্যাটার্ন, যেখানে আগে থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট আদর্শিক কাঠামো ছিল না, এবং বলশেভিক, চীনা বা ইরানি বিপ্লবের মতো, যা একটি সুনির্দিষ্ট দল এবং পূর্বনির্ধারিত আদর্শিক কাঠামোর ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, তা মূলত একটি অভ্যুত্থান। তবে এই ‘না’ বা প্রত্যাখ্যান যদি ভবিষ্যতে একটি ‘হ্যাঁ’ বা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সমর্থ হয়, তবেই তা বিপ্লবে রূপান্তরিত হবে।

অভ্যুত্থানের প্রকৃতি ও অংশীজন

সৈয়দ নিজার অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতাকে জৈন দর্শনের ‘অনেকান্তবাদ’ বা ‘অন্ধের হাতি দেখা’র গল্পের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, প্রত্যেকেই এই বিশাল ঘটনাকে নিজের অবস্থান ও পরিচিত গণ্ডি থেকে একেকভাবে অনুভব করেছেন। কোনো ব্যক্তিকে ‘অভ্যুত্থান কারা করেছে’ প্রশ্ন করলে তিনি মূলত তাঁর সঙ্গে যাঁদের যোগাযোগ ছিল, তাঁদের কথা বলবেন। ফলে কোনো ব্যক্তি যখন কাউকে মাস্টারমাইন্ড বলেন, অথবা কোনো রাজনৈতিক দলকে কৃতিত্ব দিতে চান, তখন বুঝতে হবে কাদের সঙ্গে ওই ব্যক্তির সম্পর্ক ছিল। কারণ, গণ–অভ্যুত্থান স্বতঃস্ফূর্ত, সুপরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয় না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি অভ্যুত্থান নিয়ে গবেষণার জটিলতা ব্যাখ্যা করে বলেন, আন্দোলনের সময় যে বিশাল জনসমুদ্র বা ‘মাস’ দেখা যায়, তা হলো ‘মাংসপেশি’। অভ্যুত্থান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সাধারণ জনতা উধাও হয় বা করে ফেলা হয়, কিন্তু রয়ে যায় কেবল ‘হাড়গোড়’। এই হাড়গোড়গুলো হচ্ছে সংগঠিত শক্তি। সেটা রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিকও হতে পারে। সাধারণত এই সংগঠিত শক্তিই অভ্যুত্থানের ফসল ভোগ করে থাকে। পরবর্তী সময়ে অভ্যুত্থান নিয়ে অনুসন্ধান করতে গেলে কেবল এই সংগঠিত হাড়গুলোই আমাদের নজরে আসে। ফলে আমাদের সত্যভ্রম হয়। মনে হয় কেবল বুঝি সংগঠিত শক্তিই আন্দোলনের পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন করেছে! কিন্তু এর নেপথ্যে থাকা সাধারণ মানুষের বিশাল ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের দিকটি তখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্বাধীনতা বনাম অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব

প্রশ্ন করা হয়, এটাকে অনেকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্বাধীনতা হিসেবে অভিহিত করেছেন। জবাবে সৈয়দ নিজার বলেন, স্বাধীনতা বা ‘ইনডিপেনডেন্স’ মূলত স্বায়ত্তশাসন বা স্বরাজ অর্জনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ১৯৪৭ সালে ইংরেজ ঔপনিবেশিক শক্তির বদলে নিজেদের শাসন কায়েম হয়, ১৯৭১ সালে বাঙালিরা নিজস্ব রাষ্ট্রকাঠামো পায়। কিন্তু ২০২৪ সালের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন—এখানে শাসক ও নিপীড়িত উভয় পক্ষই এ দেশের মানুষ, কোনো বহিরাগত শাসক ছিল না। তাই একে ‘স্বাধীনতা’ না বলে অন্যভাবে দেখা প্রয়োজন।

তিনি দুটি ধারণা উল্লেখ করেন: ‘অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব’ এবং ‘বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব’। বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব মানে বিদেশি শক্তি হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, আর অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব হলো নিজ জনগণের ওপর ক্ষমতাচর্চার আইনি ভিত্তি, যার মূল শর্ত নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র সেই নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে নগ্ন দমনমূলক শক্তি প্রয়োগ করছে, যা কোনো সাময়িক ঘটনা নয়, বরং গভীরে প্রোথিত দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। যাঁরা একে কেবল ‘সরকার পরিবর্তন’ বা ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ হিসেবে দেখতে চান, তাঁরা রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্বহীন করছেন।

অভ্যুত্থানের পেছনের কারণ: বিমানবিকীকরণ ও বিরাজনৈতিকীকরণ

সৈয়দ নিজার বলেন, জুলাইয়ের গণবিস্ফোরণের পেছনে দুটি তাত্ত্বিক কাঠামো কাজ করেছে: ‘বিমানবিকীকরণ’ এবং ‘বিরাজনৈতিকীকরণ’। বিমানবিকীকরণ বলতে তিনি বোঝান নাগরিকের মানবিক সত্তা ও অধিকার রাষ্ট্র কর্তৃক অস্বীকার করা। প্রচলিত মানবাধিকারের ধারণা ব্যক্তিগত অধিকার ও তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কাজ করে, কিন্তু বিমানবিকীকরণ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে মানবিক মর্যাদা থেকে বিচ্যুত করে। এই নিবর্তনমূলক ব্যবস্থার ইতিহাস ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে চলে আসছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নিয়মিত সরকারের অধীনে জুলাই মাসে নজিরবিহীন মাত্রার হত্যাযজ্ঞ দেখা গেছে।

পাশাপাশি বিরাজনৈতিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাগরিকদের যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড রুদ্ধ করা হয়েছে। শুরুতে রাজনৈতিক দলগুলো নিপীড়নের শিকার হলেও পরবর্তী সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো নিবর্তনমূলক আইনের মাধ্যমে সাধারণ জনগণকেও আওতাভুক্ত করা হয়েছে। গত এক দশকে রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেছে, ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রশাসন ও পুলিশ। এই বিরাজনৈতিকীকরণের কারণেই অভ্যুত্থানে প্রচলিত বড় দলগুলোর পরিবর্তে ছোট সংগঠনগুলো নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। যখন সমাজে সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা রুদ্ধ করা হয়, তখন উগ্র ও চরমপন্থী মতাদর্শের বিকাশের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

অন্তর্বর্তী সরকার গঠন ও সংস্কার

অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠন প্রসঙ্গে সৈয়দ নিজার বলেন, ৫ আগস্ট বাংলাদেশে আক্ষরিক অর্থেই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। ১৯৬৯ বা ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানেও ঠিক এমনটি ঘটেনি। সেদিন প্রধানমন্ত্রী থেকে খতিব পর্যন্ত প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী ব্যক্তি উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের সব কাঠামোর চরম শূন্যতা দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে তিনটি বিকল্প পথ ছিল: সামরিক শাসন, জাতীয় সরকার, বা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার।

তিনি বলেন, সামরিক বাহিনীর পক্ষে ক্ষমতা গ্রহণ বাস্তবসম্মত ছিল না, কারণ ২ আগস্টের আগপর্যন্ত জনগণের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক ইতিবাচক ছিল না। অন্যদিকে, জাতীয় সরকার গঠিত হলে তা আরও শক্তিশালী হতে পারত, কিন্তু কিছু রাজনৈতিক দল সংকীর্ণ স্বার্থে সম্মতি দেয়নি। বর্তমান সরকারের প্রক্রিয়াটি অদ্ভুত, যাকে তিনি ‘অন্ধের হাতি দেখা’র গল্পের সঙ্গে তুলনা করেন। সরকারেরও অভ্যুত্থানের প্রকৃত অংশীজন কারা, তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা ছিল না। তবে বাংলাদেশ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের বদলে শান্তিপূর্ণ উত্তরণের পথ বেছে নিয়েছে, এবং বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠনের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে গঠনমূলক আলোচনায় ধাবিত করা হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মব নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে।

জুলাই ঘোষণাপত্র ও সনদ: প্রাণের অধিকারের প্রশ্ন

সৈয়দ নিজার জুলাই ঘোষণাপত্র ও সনদ নিয়ে সমালোচনা করে বলেন, ঘোষণাপত্রে প্রধানত ‘বিরাজনৈতিকীকরণ’ সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে, অর্থাৎ রাজনৈতিক সংকট ও নির্বাচনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আন্দোলনের মূল শক্তি সাধারণ জনগণের অধিকারের প্রশ্নগুলো বাদ পড়ে গেছে। সবচেয়ে জরুরি ছিল ‘প্রাণের অধিকার’ বা জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পরবর্তী সনদে কিছু নতুন ধারণা যুক্ত হলেও ‘প্রাণের অধিকার’ সরাসরি আসেনি, বরং ‘জরুরি অবস্থা’র অনুষঙ্গ হিসেবে এসেছে।

তিনি সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদের সমালোচনা করে বলেন, সেখানে ‘আইন অনুযায়ী’ কথাটির গভীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। রাষ্ট্র যদি দমনমূলক আইন পাস করে এবং তার দোহাই দিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালায়, তবে আইনিভাবে তা অবৈধ বলা যায় না। এই অনুচ্ছেদটি ভারত ও পাকিস্তানের সংবিধানের অনুরূপ, যা জাপানের সংবিধান থেকে এসেছে, যেখানে ‘যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া’ যুক্ত করে মিত্রশক্তির বলপ্রয়োগের বৈধতা রাখা হয়। বাংলাদেশ দক্ষিণ আফ্রিকার সংবিধান অনুসরণ করতে পারত, যেখানে শর্তহীনভাবে প্রাণের অধিকার ব্যক্ত করা হয়েছে। সনদে ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ রহিত না করায় ন্যূনতম প্রাণাধিকার নিশ্চিতের জন্য ‘আইনি প্রক্রিয়া’র সীমানা নির্ধারণ জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকার মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ, পুলিশ কমিশনসহ কিছু অধ্যাদেশ প্রস্তাব করেছে। জুলাই সনদে মৌলিক অধিকারগুলোকে বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা ‘প্রাণের অধিকার’ নিশ্চিত না করলেও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে বড় পদক্ষেপ।

নির্বাচিত সরকারের ভূমিকা ও সংস্কারের ভবিষ্যৎ

প্রশ্ন করা হয়, নির্বাচিত সরকার গণভোটের রায় ও অধ্যাদেশগুলো উপেক্ষা করছে। সৈয়দ নিজার বলেন, বর্তমান সংসদ একটি অভ্যুত্থান-পরবর্তী বিশেষ পরিস্থিতির ফসল। গণভোটের প্রস্তাব বাতিল বা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ বিল ফেরত পাঠানো হয়েছে। এই সংস্কার সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবন ও অধিকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। নির্বাচিত সরকার ও সংসদ এগুলো অবজ্ঞা করলে রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের অনাস্থা তৈরি হবে, বিচ্ছিন্ন জনতা চরমপন্থী মতাদর্শের দিকে ঝুঁকতে পারে, এবং দেশ দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার দিকে ধাবিত হবে। সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের সুযোগ তৈরি হয়েছিল; জনগণ যদি এগুলোকে ফাঁকি মনে করে, তবে ভবিষ্যতে তারা আলাপ-আলোচনায় বিশ্বাস করবে না, যা রাষ্ট্রকে আরও সহিংস পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে। জনগণের মৌলিক আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষার অর্থ ‘টাইম বোমা’ তৈরি করে রাখা।

আমলাতন্ত্রের সংস্কার ও করণীয়

আমলাতন্ত্রের সংস্কার প্রসঙ্গে সৈয়দ নিজার বলেন, বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র শুধু উপনিবেশের উত্তরাধিকার নয়, ঔপনিবেশিক অভিমুখ জারি রেখেছে। তাদের প্রবণতা এখনো শাসনমুখী, ব্যবস্থাপনামুখী নয়। পদবি বা নাম চয়নেও ঔপনিবেশিক মানসিকতা প্রকাশ পায়, যেমন ‘জেলা প্রশাসক’ পদবি, যেখানে ‘ডেপুটি কমিশনার’ কোনোভাবেই স্বাধীন রাষ্ট্রে ‘প্রশাসক’ বা শাসক হতে পারেন না।

বর্তমান করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রথমত, রাষ্ট্রপক্ষের উচিত জনগণের সঙ্গে দূরত্ব কমানো এবং সংসদকে জন–অধিকার নিশ্চিতকারী বিল দ্রুত পাস করা। দ্বিতীয়ত, জাতীয় ঐকমত্য গঠন করা, যেখানে ‘অধিনীতি’ (মেটাপ্রিন্সিপাল) হিসেবে রাষ্ট্রের বিমানবিকীকরণ প্রক্রিয়া রুখে দেওয়া এবং প্রত্যেক নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আদর্শিক ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু জানমালের নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়ে সব পক্ষকে সুনির্দিষ্ট সমঝোতায় আসতে হবে।