অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে জানিয়েছেন, বহু বিতর্কিত ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬-এর ধারা ১৮(ক) পুনর্বিবেচনা করে বাতিল করা হবে। সোমবার (২৯ জুন) সংসদে অর্থবিল পাশের পর এ ঘোষণা দেন তিনি।
১৮(ক) ধারা বাতিলের কারণ
ধারা ১৮(ক)-তে বলা ছিল, ব্যাংকের আগের মালিকরা সাড়ে ৭ শতাংশ অর্থ দিয়ে আবার মালিকানা বুঝে নিতে পারবেন। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। বিরোধী দলের অভিযোগ ছিল, বিতর্কিত ব্যবসায়ীদের হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দিতেই এই ধারা যুক্ত করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, "যারা জনগণের সম্পদ লুট করেছে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না।" এ কারণে ধারাটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থ পাচার রোধে সরকারের পদক্ষেপ
অর্থমন্ত্রী জানান, অর্থ পাচার রোধ ও পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলায় দেশে-বিদেশে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স চুক্তির (এমএলএটি) অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া ও হংকংয়ের সঙ্গে দুটি এমএলএটি চূড়ান্ত হয়েছে। এছাড়া ১৫টির বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৬০টির বেশি নন ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (প্রকাশ অযোগ্য চুক্তি) স্বাক্ষর করেছে।
সরকারের ঋণ ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার
অর্থমন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩৮.৬১ শতাংশ। এর মধ্যে দেশীয় ঋণ ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫৩ কোটি এবং বিদেশি ঋণ ৯ লাখ ৪৯ হাজার ১৮১ কোটি টাকা। ঋণের চাপ কমাতে ঋণনির্ভর অর্থনীতিকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুঁজিবাজার ও আর্থিক খাতের সংস্কার করে ব্যাংকের বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নির্ভরতা কমানো হবে। বন্ড মার্কেট উন্নয়ন ও ইকুইটি অর্থায়নের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়ন হবে। বিকল্প অর্থায়নের অংশ হিসেবে হংকং, লন্ডন ও নিউইয়র্কে শুধু বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পুঁজিবাজারের জন্য প্রণোদনা
পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়নে বেশ কয়েকটি প্রণোদনা ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী। জিরো কুপন বন্ডের আয় করমুক্ত থাকবে। শেয়ার হস্তান্তরের আগে বাজারে তালিকাভুক্ত হলে করের হার ২.৫ শতাংশ কমবে। আইপিও, সরাসরি তালিকাভুক্তি, রাইট শেয়ার এবং আরপিওর মাধ্যমে ১০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার ছাড়লে কর আরও ২.৫ শতাংশ কমবে। কোনো কোম্পানি সব লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করলে অতিরিক্ত ২.৫ শতাংশ কর অব্যাহতি পাবে। শেয়ারবাজারে ১০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার ছেড়েছে এমন কোম্পানি নগদহীন (ক্যাশলেস) লেনদেন করলে করের হার ৭.৫০ শতাংশ কমবে। কোম্পানি করদাতাদের লভ্যাংশের ওপর করের হার কমিয়ে ২০ শতাংশ এবং ব্যক্তি করদাতাদের জন্য ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াতের ক্ষেত্রে ৫ লাখ টাকার বিনিয়োগ সীমা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
আইএমএফ প্রসঙ্গ
একজন সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে শূন্য হাতে ফেরেনি। বরং দেশের স্বার্থপরিপন্থি কিছু শর্ত গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় সরকার নিজেই ওই প্রোগ্রাম থেকে বেরিয়ে এসেছে।
আমানতকারীদের সুরক্ষা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ব্যক্তিগত আমানতকারীরা তাদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত তাৎক্ষণিক পেতে পারবেন। অবশিষ্ট অর্থ ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়া হবে। আগামী অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭.৫ শতাংশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সরকার সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখছে। নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে ৬০টি পণ্যের উৎসে কর কমানো হয়েছে। ব্যবসার খরচ কমাতে বিনিয়ন্ত্রণকরণ ও ডিজিটাইজেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাজস্ব আদায়ে মাইলফলক
অর্থমন্ত্রী জানান, সরকারের উদ্যোগের ফলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায় প্রথমবার ৪ লাখ কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করেছে। বাজেট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী ফ্ল্যাট রেটে ভ্যাট প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে কাঁচাবাজার ও ক্ষুদ্র মুদি দোকান এই ভ্যাটের আওতার বাইরে থাকবে।



