নারায়ণগঞ্জের মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যা ও বিচারহীনতার ১৬০ মাস উপলক্ষে মোমশিখা প্রজ্জ্বালন কর্মসূচি পালন করেছে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট। বুধবার সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ নগরের আলী আহাম্মদ চুনকা নগর মিলনায়তন প্রাঙ্গণে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
ত্বকীর বাবার বক্তব্য
কর্মসূচিতে ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি বলেন, নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবারের দখল-চাঁদাবাজির জায়গাগুলো এখন বিএনপির কিছু নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এরপরও তিনি এ সরকারের প্রতি আস্থা রাখতে চান। তাঁর বিশ্বাস, ত্বকী হত্যাসহ আলোচিত সব হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করবে এ সরকার।
রফিউর রাব্বি আক্ষেপ করে বলেন, দুই বছর আগে এই জুলাই মাসে ৩৮ শিশুকে হত্যা করা হয়েছিল; এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের ৫ জন রয়েছে। ১ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ছাত্র–জনতাকে হত্যা করা হয়েছিল। নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবার হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তারা ত্বকীকেও হত্যা করেছিল। সেই আত্মত্যাগের পরও মানুষ যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ওসমান পরিবারের দখল বিএনপির নিয়ন্ত্রণে
ত্বকীর বাবা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি অভিযোগ করেন, নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন ব্যবসা, পরিবহন, হাট-বাজার, ঘাট ও স্ট্যান্ড এখন বিএনপির কতিপয় লোক পরিচালনা করছেন। তাঁরা সেই টাকা ঘাতকদের কাছে পাঠাচ্ছেন। রফিউর রাব্বির দাবি, এসব খাত থেকে এখনো চাঁদাবাজি চলছে এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়টি জানলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
রফিউর রাব্বি বলেন, ‘আমরা এক দখলবাজকে হটিয়ে আরেক দখলবাজ চাইনি। আমরা ব্যবস্থার পরিবর্তন, বৈষম্যের অবসান ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা চেয়েছি। আমরা এখনো এই সরকারের প্রতি আস্থা রাখতে চাই। তাই ত্বকী হত্যার বিচার চাই। সাগর-রুনি, তনু, আশিক, চঞ্চল, বুলু, মিঠুসহ সব আলোচিত হত্যাকাণ্ড এবং চব্বিশের ছাত্র–জনতার গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের হত্যার বিচার চাই।’
অন্যান্য বক্তাদের বক্তব্য
নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মনি সুপান্থর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক দীনা তাজরীনের সঞ্চালনায় কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য দেন শিশু সংগঠক রথীন চক্রবর্তী, সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের সদস্যসচিব হালিম আজাদ, দৈনিক খবরের পাতার সম্পাদক মাহবুবুর রহমান, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি ভবানী শংকর রায়, নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক, ন্যাপের জেলা সভাপতি আওলাদ হোসেন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সভাপতি মাহমুদ হোসেন, সামাজিক সংগঠন সমমনার সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং বাসদের জেলা সংগঠক প্রদীপ সরকার।
বক্তারা বলেন, ত্বকী হত্যা মামলার তদন্তে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো অভিযোগপত্র আদালতে জমা না হওয়া বিচারপ্রত্যাশী মানুষের জন্য হতাশাজনক। দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল করে বিচার কার্যক্রম শুরুর দাবি জানান তাঁরা।
ত্বকী হত্যার ঘটনা
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নগরের শায়েস্তা খাঁ রোডের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। ২ দিন পর ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খাল থেকে ত্বকীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই বছরের ১২ নভেম্বর আজমেরী ওসমানের সহযোগী সুলতান শওকত ভ্রমর এবং ২৪ নভেম্বর ২০২৪ কাজল হাওলাদার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানান যে আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ত্বকীকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়।
২০১৪ সালের ৫ মার্চ তদন্তকারী সংস্থা র্যাব সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের নির্দেশে তাদেরই টর্চার সেলে ১১ জন মিলে ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছে। অচিরেই তারা অভিযোগপত্র আদালতে পেশ করবে। কিন্তু সে অভিযোগপত্র আজও পেশ করা হয়নি। ত্বকী হত্যার পর থেকে বিচার শুরু ও চিহ্নিত আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে প্রতি মাসের ৮ তারিখ আলোক প্রজ্বালনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট।



