এমপি কামাল হোসেনের তীব্র অভিযোগ: রাত ২টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়েও জ্বালানি পাননি
বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর সংসদ সদস্য কামাল হোসেন সংসদে একটি গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরেছেন। তিনি দাবি করেছেন, গত রাতে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে রাত ২টা পর্যন্ত রাস্তায় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও গাড়ির জন্য জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারেননি। এই মর্মন্তুদ অভিযোগটি তিনি উত্থাপন করেছেন বুধবার (১৫ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৪তম দিনে।
সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় উঠে এলো জ্বালানি সংকটের কথা
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা-৫ আসনের এই সংসদ সদস্য তার বক্তব্যে জ্বালানি সংকটের চিত্রটি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলেন। বিকালের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। কামাল হোসেন সংসদে বলেন, "গতরাতে আমাকে ২টা পর্যন্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। আমি তেল পাইনি।" তিনি রসিকতা করে আরও যোগ করেন, "তেল শুধু মহান সংসদে—এত পরিমাণ তেল এখানে অপচয় হচ্ছে। বাইরে তেল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।"
যাত্রাবাড়ীর দীর্ঘদিনের অবহেলা ও গ্যাস সংকট
নিজ সংসদীয় এলাকা যাত্রাবাড়ীর অবস্থা তুলে ধরে কামাল হোসেন বলেন, দীর্ঘ ৫৫ বছর পরও এই অঞ্চলটি মারাত্মকভাবে অবহেলিত রয়ে গেছে। রাজধানী ঢাকার পাশে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও এলাকায় উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া লাগেনি বলে তিনি উল্লেখ করেন। অধিকাংশ বাড়িতে গ্যাস সংযোগ থাকলেও নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় বাসিন্দাদের মারাত্মক সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
পুরোনো ও জরাজীর্ণ গ্যাস লাইনের কারণে দিনের রান্না রাতে করতে হচ্ছে বলে তিনি জানান। অনেক ক্ষেত্রে রাত ২টায় রান্না করতে বাধ্য হচ্ছেন স্থানীয়রা—যেন রমজান মাসের মতো সারা বছরই সেহরি খেতে হচ্ছে। এই অবস্থাকে তিনি অত্যন্ত দুঃখজনক বলে আখ্যায়িত করেন।
চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস উন্নয়নের পথে বড় বাধা
কামাল হোসেন আরও অভিযোগ করেন, বিভিন্ন স্থানে লিজ দেওয়ার কারণে চাঁদা তোলা হচ্ছে এবং এতে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। মাদক, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস তার মতে উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। অতীতে এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেকেই প্রাণ দিয়েছেন বলেও তিনি স্মরণ করেন।
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কথা বলায় সম্প্রতি নূরে আলম খাইরুল নিহত হয়েছেন। এই ঘটনাটি এলাকায় আইনের শাসনের মারাত্মক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
শিক্ষা খাতে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ
শিক্ষা খাতের দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে কামাল হোসেন বলেন, অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় দ্বিগুণ শিক্ষক রয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, "যেখানে ৭২ জন শিক্ষক দরকার, সেখানে ১৪২ জন কীভাবে থাকে?" এই বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, উন্নয়ন কোনো দলীয় বিষয় নয়, বরং এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। সকলের জন্য সমান উন্নয়ন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
গণভোট নিয়ে দ্বৈত অবস্থান ও সংবিধান সংস্কারের আহ্বান
নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে কামাল হোসেন বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তাকে ৮৫৩ দিন কারাভোগ করতে হয়েছে এবং নয়বার কারাগারে যেতে হয়েছে। দেশে গণভোটের ইতিহাস উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন, আগে যে দল গণভোট চালু করেছিল, এখন তারাই তা অস্বীকার করছে।
তিনি আরও বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গণভোটকে বৈধ বলেছেন। সেক্ষেত্রে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা উচিত বলে তিনি মত দেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা না হলে সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
কামাল হোসেনের এই বক্তব্য সংসদে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। জ্বালানি সংকট থেকে শুরু করে উন্নয়ন বৈষম্য, চাঁদাবাজি ও শিক্ষা খাতের দুর্নীতি—বিভিন্ন ইস্যুতে তার তীব্র অভিযোগগুলো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রামের প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।



