জাতীয় সংসদে অন্তর্বর্তীকালীন অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর: ৯১টি বিল পাস সম্পন্ন
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যেখানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপান্তরের লক্ষ্যে মোট ৯১টি বিল পাস হয়েছে। এই অধিবেশনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা বিলগুলো উত্থাপন করেন এবং কন্ঠ ভোটের মাধ্যমে সেগুলো অনুমোদন লাভ করে।
সকালের অধিবেশনে ২৪টি বিলের পাস
সকালের স্টেশনে মোট ২৪টি বিল পাস হয়েছে, যার মধ্যে 'জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬', 'জুলাই গণঅভ্যুত্থান শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিল, ২০২৬' এবং 'ব্যাংক রেজল্যুশন বিল, ২০২৬' উল্লেখযোগ্য। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম জানান, আজকের পাস হওয়া ২৪টি বিল নিয়ে চলতি অধিবেশনে এ পর্যন্ত ৯১টি বিল পাস হয়েছে, যা সরকারের আইনি সংস্কারের একটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্তর্বর্তীকালীন অধ্যাদেশের প্রক্রিয়া ও সুপারিশ
অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে সংসদের বিশেষ কমিটি ৯৮টি অপরিবর্তিতভাবে এবং ১৫টি সংশোধনসহ পাসের সুপারিশ করে। বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি বাতিল এবং ১৬টি আরও শক্তিশালী করে নতুন বিল আকারে আনার সুপারিশ করা হয়। এই প্রক্রিয়া সরকারের আইনি কাঠামোকে সুসংহত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ বিলসমূহ
শুক্রবারের অধিবেশনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে উত্থাপিত বিলগুলোর মধ্যে নিম্নলিখিতগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:
- গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের কর্তৃক উত্থাপিত নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬।
- সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী কর্তৃক উত্থাপিত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (সংশোধন) বিল, ২০২৬।
- পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু কর্তৃক উত্থাপিত বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন বিল, ২০২৬ এবং বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিল, ২০২৬।
- অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কর্তৃক উত্থাপিত আমানত সুরক্ষা বিল, ২০২৬, এক্সাইজেস অ্যান্ড সল্ট বিল, ২০২৬, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) বিল, ২০২৬, গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) বিল, ২০২৬, বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) বিল, ২০২৬ এবং অর্থ ২০২৫-২০২৬ অর্থবছর বিল, ২০২৬।
- শিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন কর্তৃক উত্থাপিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি বিল, ২০২৬ এবং বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত কতিপয় আইন (সংশোধন) বিল, ২০২৬।
- ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম কর্তৃক উত্থাপিত জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা বিল, ২০২৬ এবং সাইবার সুরক্ষা বিল, ২০২৬।
- মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন কর্তৃক উত্থাপিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল, ২০২৬।
- মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান কর্তৃক উত্থাপিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিল, ২০২৬।
এছাড়া, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ কর্তৃক উত্থাপিত মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬ এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন কর্তৃক উত্থাপিত ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬ সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছে।
বিরোধিতা ও সংশোধনীর ঘটনা
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কর্তৃক উত্থাপিত 'ব্যাংক রেজল্যুশন বিল, ২০২৬' পাসের প্রস্তাব করলে ঢাকা-১২ আসনের বিরোধী দলের সদস্য সাইফুল ইসলাম মিলন বিলটির উত্থাপনের বিরোধিতা করে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব করেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বিষয়টি ভোটে দেন এবং কন্ঠভোটে জনমত যাচাই প্রস্তাবটি নাকচ হওয়ার পর বিলটি পাস হয়।
অন্যদিকে, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী কর্তৃক উত্থাপিত 'জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬' পাসের প্রস্তাব করলে মাদারীপুর-৩ আসনের সরকারি দলের সদস্য আনিছুর রহমান তিনটি সংশোধন প্রস্তাব করেন, যা স্পিকার কর্তৃক গ্রহণ করা হয় এবং পরে বিলটি সংসদে স্থিরকৃত আকারে পাস হয়।
সংসদের পরবর্তী কার্যক্রম
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ আগামী ১৫ এপ্রিল সকাল ১১টা পর্যন্ত সংসদ মুলতবি ঘোষণা করেন, যা আইনি প্রক্রিয়াগুলোকে আরও সুসংহত করতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই অধিবেশনে পাস হওয়া বিলগুলো দেশের আইনি কাঠামোকে শক্তিশালী করতে এবং অন্তর্বর্তীকালীন অধ্যাদেশগুলোর স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



