জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ঐকমত্য নেই, সংসদে সরকারি-বিরোধী দলের অবস্থান অনড়
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংসদে ঐকমত্য নেই, দলীয় অবস্থান অনড়

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংসদে আলোচনা, কিন্তু সরকারি-বিরোধী দলের মধ্যে ঐকমত্য অর্জিত হয়নি

জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি কী হবে, তা নিয়ে একটি মুলতবি প্রস্তাবের ওপর গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও এ বিষয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এই প্রশ্নে আগের অবস্থানেই অনড় থাকে সরকারি দল বিএনপি এবং বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

সরকারি দল বিএনপির অবস্থান: নোট অব ডিসেন্টসহ সনদ মানার অঙ্গীকার

বিএনপি দৃঢ়ভাবে জানিয়েছে যে, নোট অব ডিসেন্টসহ (ভিন্নমত) যেভাবে জুলাই জাতীয় সনদ সই হয়েছে, সেটা তারা অক্ষরে অক্ষরে মানবে। তারা সে অনুযায়ী সংসদে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধনের কথা বলেছে। সংসদ নেতা তারেক রহমানের পক্ষে আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উল্লেখ করেন যে, বিএনপি জুলাই সনদের সব দফা ও অঙ্গীকারনামা শতভাগ পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ। তিনি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে ‘কালারেবল লেজিসলেশন’ (ছদ্মবেশী আইন) হিসেবে আখ্যা দেন এবং অভিযোগ করেন যে, সংবিধানের পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তফসিল বিলুপ্তির মতো কিছু প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়েছিল, কিন্তু পরে সেগুলো সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

বিরোধী দলের অবস্থান: সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান

অন্যদিকে, বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি বিদ্যমান সংবিধানের সংস্কার চায়। তারা দাবি করে যে, সংবিধানের ওই জায়গাগুলো পরিবর্তন প্রয়োজন, যেগুলো গত ৫৪ বছরে বারবার ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে। এ জন্য তারা নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া জুলাই সনদের সব মূল প্রস্তাব পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের পক্ষে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা প্রয়োজন বলে মনে করে। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, ‘সময়সীমা চলে গেলেও মনখোলা রাখলে এখনো রাস্তা বের করা সম্ভব। আমরা সেই রাস্তা বের করে এগিয়ে যেতে চাই।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আলোচনার প্রেক্ষাপট ও পূর্ববর্তী ঘটনাবলি

গতকাল সরকারি দলের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার জন্য সংসদে মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবের ওপর সরকারি ও বিরোধী দলের ৯ জন সদস্য আলোচনায় অংশ নেন, যেখানে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এর আগে, গত বুধবারও জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান নিয়ে বিরোধী দলের একটি মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, কিন্তু সেদিনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

আইনমন্ত্রী ও অন্যান্য বক্তাদের বক্তব্য

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কোন পদ্ধতিতে হবে, তা সনদেই ব্যাখ্যা করা আছে এবং এটি পরিপূর্ণ স্বচ্ছভাবে রক্তের ঋণ হিসেবে প্রতিফলিত হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘জুলাই সনদ জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন। ৩৩টি দল একমত হয়েছে যে আমরা এমন একটি সংবিধান চাই, যা বর্তমান সংবিধানকে সামনে রেখে সংযোজন-বিয়োজন ও পরিমার্জন হবে।’

বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সভাপতি আন্দালিভ রহমান পার্থ আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘আমরা চাই জুলাই সনদের বিষয়গুলো সংবিধানে আসবে। সংসদের রীতিনীতি মেনেই এটা আসবে। আমার মনে হয় এটা নিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।’

বিরোধী দলের অতিরিক্ত দাবি ও সমালোচনা

এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন অভিযোগ করেন যে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু তার ফলাফল এখন বিএনপি মানতে চায় না। তিনি বলেন, ‘সংস্কারের ঘোড়া অনেক দূর এগিয়ে গেছে, এখন সরকার সেখানে লাগাম লাগাতে চাইছে।’ জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান যোগ করেন যে, সংবিধানের দোহাই দিয়ে সরকারি দল জনরায়কে অবজ্ঞা করছে, যা প্রকারান্তরে সংবিধানকেই অবজ্ঞা করার শামিল।

অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে বিএনপির জয়নুল আবদিন ফারুক, মীর হেলাল উদ্দিন এবং জামায়াতের গাজী এনামুল হক আলোচনায় অংশ নেন। পরে স্পিকার আজ সোমবার বেলা সাড়ে তিনটা পর্যন্ত অধিবেশন মুলতবি করেন, যা এই রাজনৈতিক অচলাবস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখা যাচ্ছে।