বিএনপি জুলাই সনদ আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করল, সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব
বিএনপি জুলাই সনদ আদেশ অবৈধ বলল, সংবিধান সংশোধনে কমিটি

বিএনপি জুলাই সনদ আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করল, সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জারিকৃত ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এবং ‘গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫’-কে ‘সম্পূর্ণ বেআইনি ও অবৈধ’ বলে আখ্যায়িত করেছে সরকারি দল বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল ও জাতীয় প্রতারণা। এই আদেশের কোনো আইনি বৈধতা নেই এবং এটি সূচনা থেকেই অবৈধ।’

সংসদে তীব্র বিতর্ক ও বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব

কার্যপ্রণালী বিধির ৬২ বিধিতে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা মো. শফিকুর রহমানের আনা ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ (আদেশ নং ০১, ২০২৫) এর অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান প্রসঙ্গে জরুরি জনগুরুত্ব বিষয়ে আলোচনা’ শীর্ষক মুলতবি প্রস্তাবের ওপর গতকাল মঙ্গলবার সংসদে পূর্বনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একথা বলেন।

পরে রাষ্ট্র কাঠামো মেরামত প্রস্তাব তুলে ধরে সালাহ উদ্দিন আহমদ সংসদে বলেন, ‘আমি সংসদ নেতার (প্রধানমন্ত্রী) পক্ষে প্রস্তাব রাখছি সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হোক। ওই কমিটিতে সবার আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে জনপ্রত্যাশিত একটি সংবিধান সংশোধনী বিল এই মহান সংসদে উত্থাপন ও গ্রহণ করা হোক।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আলোচনা শেষে তার এই প্রস্তাবটি স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভোটে দিলে তা কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়। গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিল জাতীয় সংসদ। এটি গৃহীত হওয়ার আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কমিটিতে সরকারি দলের, বিরোধী দলের ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য থাকবেন। প্রয়োজনে এবিষয়ে বিশেষজ্ঞরাও কমিটিতে থাকতে পারেন।

বিরোধীদলীয় নেতার সমালোচনা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

অন্যদিকে, মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপনকারী ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে বিশেষ কমিটিতে যেন সরকারি ও বিরোধীদল থেকে সমান সংখ্যক সদস্য রাখা হয় সেই প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি দেশের ইতিহাসে বারবার জনগণের ভোটাধিকার হরণ ও হত্যা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করে বলেন, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তার মূল লক্ষ্যই হলো দেশে যেন আর কখনো ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে না পারে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের (২০০৯-২০২৪) কড়া সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সর্বশেষ ২০০৯ সালে যারা সরকার গঠন করেছিল, তারা ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে ডামি ও প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ধরে জাতির ওপর প্রচণ্ড দুঃশাসন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এসময় তিনি গুম-খুনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, অসংখ্য মায়ের বুক খালি হয়েছে, শিশুরা এতিম হয়েছে। অনেক লোককে গুম করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৩৫ জন মানুষ এখনো আপনজনের কাছে ফিরে আসেননি। এই সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ২ হাজার ৬৬২ জন মানুষ, যারা ন্যূনতম বিচার পাওয়ার সুযোগ পাননি।

আদেশের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন

মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এই আদেশটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্তহীন একটি প্রতারণার দলিল। রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) এই আদেশে উল্লেখ না করে এটি জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা একটি জাতীয় প্রতারণা।

আদেশের আইনি দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিলের পর রাষ্ট্রপতির আর এ ধরনের আদেশ জারির ক্ষমতা ছিল না। তাহলে রাষ্ট্রপতি এই আদেশ জারি করলেন কীভাবে? যেই আদেশের জন্মই বৈধ হলো না, সেই আদেশ লিগ্যাল ল্যাঙ্গুয়েজে ‘ভয়েড অ্যাব ইনিশিও’ বা সূচনা থেকেই বাতিল। এটি অধ্যাদেশও নয়, আইনও নয়।

গণভোটের ব্যালট নিয়ে সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণভোটের ব্যালটে চারটি প্রশ্ন দিয়ে জনগণকে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে। এটি তো কলার ভেতরে তিতা ওষুধ ঢুকিয়ে জোর করে খাওয়ানোর মতো অবস্থা। কোনো আইনকে আপনি জাতিকে এভাবে বাধ্য করে খাওয়াতে পারেন না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মৌলিক কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার রাখে না।

বিভিন্ন দলের অবস্থান ও সংসদীয় বিতর্ক

সংবিধান ছুড়ে ফেলার সমালোচনা করে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ প্রশ্ন রেখে বলেন, সংবিধান ছুড়ে ফেলব কেন। এই সংবিধানে এত গাত্রদাহ কেন। সংবিধান কি মনে করিয়ে দেয় এটা একাত্তরের পরাজয়ের দলিল? পার্থ বলেন, জুলাই নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই, আমাদের সমস্যা হচ্ছে প্রক্রিয়া নিয়ে।

আন্দালিব রহমান পার্থের বক্তব্যের জবাবে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, যারা কখনও কখনও কনফার্মিস্ট, কখনও কখনও রিফর্মিস্ট, তারা মূলত অপর্চুনিস্ট। আমি সংবিধানের কিছু কিছু ধারা মানবো, আর কিছু কিছু ধারা মানবো না। আমি কখনও কখনও সাংবিধানিক, কখনও কখনও অসাংবিধানিক।

এনসিপির আখতার হোসেন বলেন, তারেক রহমান আমাদের প্রধানমন্ত্রী। তিনি ৩০ জানুয়ারি রংপুরে আবু সাঈদের জন্মভূমিতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, দয়া করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিন। তারা এখন এসে গণভোটের রায় মানতে কেন চান না, সেই প্রশ্নটা আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে করতে চাই।

বিএনপির দলীয় অবস্থান পরিষ্কার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সারাদেশে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে যে, বিএনপি সংস্কার চায় না বা জুলাই জাতীয় সনদ মানে না। কিন্তু, আমরা ঐতিহাসিকভাবে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অক্ষর, শব্দ ও বাক্য ধারণ করি। আমরা রাজনৈতিক সমঝোতার দলিলের ভিত্তিতে সংস্কার চাই, কোনো অবৈধ আদেশের ভিত্তিতে নয়। দেশের জনগণ বিএনপিকে ৫১ শতাংশ ভোট দিয়ে ম্যান্ডেট দিয়েছে।