সংসদে সংবিধান সংস্কার আলোচনায় আইনমন্ত্রীর 'মিসকোট' নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতার অভিযোগ
সংবিধান সংস্কারে আইনমন্ত্রীর 'মিসকোট' নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতার অভিযোগ

সংসদে সংবিধান সংস্কার বিতর্কে আইনমন্ত্রীর 'মিসকোট' নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতার তীব্র প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান একটি গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, সংসদে সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত আলোচনার সময় আইনমন্ত্রী তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে মিসকোট বা ভুলভাবে উপস্থাপন করেছেন। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) রাতে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা ডাকার বিষয়ে তোলা মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনা শেষে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এই বক্তব্য দেন।

সরকারি দলের প্রস্তাব ও বিরোধীদলীয় শর্ত

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন, 'বক্তব্যের একপর্যায়ে সরকারি দল থেকে একটা কমিটি গঠনের প্রস্তাব এসেছে। আমরা বলেছি যে আমরা তো এখানে সংকট নিরসন করতে এসেছি, সংকট তৈরি করতে আসিনি। অতএব আমরা সমস্যার সমাধান চাই। এখন কিন্তু বিষয়টা একটা সমস্যার মধ্যে ঢুকে গেছে।' তিনি আরও যোগ করেন, 'তাহলে যে প্রস্তাবটা দেওয়া হয়েছে আমরা বলেছি, এখানে সংস্কার পরিষদ এবং পরিষদের সভা আহ্বান সংক্রান্ত এই নোটিশ। যদি এই বিষয়কে কেন্দ্র করে কোনও সংস্কার বিষয়ক কমিটি গঠন করা হয় তাহলে আমাদের এটাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার সুযোগ আছে।'

তবে শফিকুর রহমান একটি কঠোর শর্ত আরোপ করেছেন। তিনি বলেন, 'শর্ত হচ্ছে সেখানে উভয়পক্ষ থেকে সমান সংখ্যক সদস্য থাকবে। যদি সমান সংখ্যক সদস্য না থাকে সংসদের সংসদ সদস্যদের অনুপাত হারে যদি সেখানে সদস্য নির্ধারণ করা হয় তাহলে সেখান থেকে ভালো কোনও আউটকাম আসার সম্ভাবনা নেই।' এই বক্তব্যে তিনি বিরোধী দলের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আইনমন্ত্রীর 'মিসকোট' ও আলোচনা স্থগিত

ব্রিফিংয়ে শফিকুর রহমান আরও বিস্তারিত জানান, 'আমরা এই প্রস্তাব নমনীয়ভাবে বিবেচনা করার পর আইনমন্ত্রী বক্তৃতা দেন এবং আমাকে মিসকোট করেন। যে প্রস্তাব তারা সংবিধান সংশোধনের জন্য দিয়েছেন, আমরা তা গ্রহণ করছি। আসলে আমরা সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত কোনো প্রস্তাবে মতামত দেইনি। আমরা বলেছি বিষয়টি সংবিধান সংস্কারের। তাই আশা করি এখানে কোনও ভুল বোঝাবুঝি হবে না। আমার বক্তব্য স্পষ্ট ছিল, কোনো অস্পষ্টতা ছিল না।'

তিনি পরিস্থিতির আরও বিবরণ দিয়ে বলেন, 'পরে আমরা বিষয়টি ক্ল্যারিফাই করতে চাইলেও আলোচনার কর্মঘণ্টা শেষ হয়ে গিয়েছিল। স্পিকার তখন বলেন, আজকের আলোচনা এখানে সমাপ্ত হলো। আমি বললাম যে আমাদের কৈফিয়ত আছে, সুযোগ দেওয়া হোক। তিনি বলেন, কালকে সুযোগ দেওয়া হবে। এভাবেই বিষয়টি আপাতত স্থগিত রয়েছে। আগামীকাল যদি আবার কথা বলার সুযোগ পাই, আমরা আপনাদের জানাব।' এই বিবৃতি থেকে স্পষ্ট যে, আলোচনা অসমাপ্ত রয়ে গেছে এবং আগামী দিনে এটি পুনরায় শুরু হতে পারে।

সংবিধান সংস্কারের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একটি গভীর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, 'বর্তমান জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে বিশেষ প্রেক্ষাপটে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণআন্দোলন এবং ২০০৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মানুষের অধিকার ও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।'

তিনি উল্লেখ করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের ছয়টি সংস্কার কমিশন এবং পরে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ আলোচনার পর জুলাই চার্টারে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়। শফিকুর রহমান আরও বলেন, 'সংসদ গঠনের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান করতে হবে। কিন্তু এই নিয়ম অনুযায়ী দ্বিতীয় অধিবেশন এখনও হয়নি।' এই বক্তব্যে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনে বিলম্বের দিকে ইঙ্গিত করেন।

ভবিষ্যতের আলোচনা ও জনগণের প্রত্যাশা

শফিকুর রহমান তার বক্তব্য শেষ করেন ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করে। তিনি বলেন, 'যদি সংস্কার বিষয়ক কমিটি গঠিত হয়, সেখানে উভয়পক্ষের সমান সংখ্যক সদস্য থাকা আবশ্যক। অনুপাত অনুযায়ী সদস্য থাকলে ভালো ফলাফল আশা করা যায় না।' তিনি আরও যোগ করেন, 'সংসদের আলোচনায় আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট ছিল। আমরা অপেক্ষা করছি আগামীকালের জন্য, যাতে বিষয়টি বাস্তবতা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার আলোকে সমাধান হয়।'

এই পুরো ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং দলীয় বিভেদের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। বিরোধীদলীয় নেতার এই অভিযোগ ও দাবিগুলো আগামী দিনের সংসদীয় আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।