সংসদে বিরোধী নেতার তীব্র অভিযোগ: ভোটাধিকার হরণ ও হত্যার দীর্ঘ ইতিহাসের কথা উল্লেখ
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান দেশের ইতিহাসে বারবার জনগণের ভোটাধিকার হরণ ও হত্যা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। মঙ্গলবার সংসদে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ শীর্ষক নির্ধারিত আলোচনার সূচনা বক্তব্যে তিনি এসব কথা তুলে ধরেন।
গণতন্ত্রের মূলনীতির প্রতি ইঙ্গিত ও অতীতের সমালোচনা
ডা. শফিকুর রহমান তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেখানে কোনও রাজতন্ত্র থাকে না, সেখানে বংশপরম্পরায় শাসনের ব্যবস্থাও থাকে না।’ তিনি ব্যাখ্যা করেন যে জনগণের ভোটের মাধ্যমেই সরকার গঠিত হয় এবং দেশ পরিচালনা করা উচিত। তবে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘অতীতে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও বারবার এই ভোটাধিকার খর্ব করা হয়েছে, এমনকি কোনও কোনও ক্ষেত্রে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে।’
দেশের প্রথম নির্বাচিত সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের সুযোগ পাওয়া ব্যক্তিরাই পরবর্তীতে বহুদলীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করেছিলেন।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘বাহাত্তরের সংবিধানে একদলীয় শাসনব্যবস্থা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হওয়ায় জনগণের ভোটের আর কোনো মূল্যায়ন ছিল না।’
সম্প্রতিক সময়ের তীব্র অভিযোগ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিবরণ
শফিকুর রহমান তাঁর বক্তব্যে ২০০৯ সাল থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাবলির উপরও আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, ‘সর্বশেষ ২০০৯ সালে যারা সরকার গঠন করেছিল, তারা ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে ডামি ও প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে।’ তিনি অভিযোগ করেন যে দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ধরে জাতির ওপর প্রচণ্ড দুঃশাসন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তাঁর মতে, এই সময়ে অসংখ্য মায়ের বুক খালি হয়েছে, শিশুরা এতিম হয়েছে এবং অনেক লোককে গুম করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘২৩৫ জন মানুষ এখনও আপনজনের কাছে ফিরে আসেননি। এই সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন দুই হাজার ৬৬২ জন মানুষ, যারা ন্যূনতম বিচার পাওয়ার সুযোগ পাননি।’ এছাড়া তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দলীয় কর্তৃত্ব কায়েম করা হয়েছিল।
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের গুরুত্ব ও লক্ষ্য
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর বলেন, ‘এসব অপকর্মের পরিণতি হিসেবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তরুণ ছাত্রসমাজের দাবানল জ্বলে ওঠে, যা ৫ আগস্ট পরিণতি লাভ করে।’ তিনি ব্যাখ্যা করেন যে এই জন্যই দেশের ক্যালেন্ডারে ৩৬ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘এই আন্দোলনে শুধু নির্দিষ্ট কোনও গোষ্ঠীর নয়, কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি জনতা, মাঝি, মজুর— সবাই সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। দুধের শিশু নিয়ে মা রাস্তায় নেমেছিলেন এবং চার বছরের শিশুও এই আন্দোলনে শহীদ হয়েছে।’
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা
‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ উত্থাপনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘এত রক্তের বিনিময়ে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা হলো ওই ফ্যাসিবাদ যেন আর ফিরে না আসে।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন যে একটি ন্যায্যতার ভিত্তিতে, ন্যায়বিচারের ওপর ভিত্তি করে এমন একটি দেশ কায়েম হবে, যেখানে নাগরিক হিসেবে সবাই সমান অধিকার পাবে।
তিনি বলেন, ‘এই আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতেই প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কারের প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি এ বিষয়ে আদেশ জারি করেছেন।’ তাঁর মতে, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তার মূল লক্ষ্যই হলো দেশে যেন আর কখনও ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে না পারে।



