সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সংসদে উত্তপ্ত বিতর্ক
রোববার (২৯ মার্চ ২০২৬) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ আহ্বানের দাবি নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক সংঘটিত হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫-এর আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিশেষ অধিবেশন আহ্বানের দাবি জানান।
বিরোধী দলীয় নেতার নোটিশ উত্থাপন
প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে পয়েন্ট অব অর্ডারে কথা বলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, "স্পিকারের পরামর্শ অনুযায়ী আমি যথাযথভাবে নোটিশটি উত্থাপন করলাম। জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫-এর আলোকে আমি সংবিধান সংস্কার পরিষদ আহ্বানের বিষয়ে নোটিশটি উত্থাপন করছি। আপনি আলোচনার জন্য এটি মঞ্জুর করবেন বলে বিশ্বাস করি।"
সংসদীয় বিধি নিয়ে দ্বন্দ্ব
জামায়াত আমিরের বক্তব্যের পরপরই সরকারি দলের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, "আমাদের প্রথা অনুযায়ী তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন এবং ৭১ বিধি শেষ হওয়ার পরই যেকোনো বিষয় উত্থাপন করা হয়। বিরোধী দলীয় নেতাকে অনুরোধ করব বিধি শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে।"
এর জবাবে শফিকুর রহমান দাবি করেন, "সেদিন (১৫ মার্চ) স্পিকার বলেছিলেন—এ ধরনের আলোচনার বিষয় থাকলে প্রশ্নোত্তরের পরেই হবে। সেই মোতাবেক দাঁড়িয়েছি। আমি মনে করি, এটা আমার অধিকার ও দায়িত্ব।"
মন্ত্রী ও ডেপুটি স্পিকারের বক্তব্য
এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ চিফ হুইপের কাছে এক মিনিট সময় চাইলে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা আপত্তি জানান। মন্ত্রী বলেন, "এটা স্পিকারের এখতিয়ার। তিনি সময় না দিলে আমি বসে পড়তে পারি।" ডেপুটি স্পিকার তাকে বক্তব্য শেষ করতে বললে মন্ত্রী জবাব দেন, "আপনি পয়েন্ট অব অর্ডারের অনুমতি না দিলে বসে পড়তে পারি। আপনি দাঁড় করিয়ে রাখতে পারেন, এটা আপনার ক্ষমতা।"
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, "বিরোধী দলীয় নেতা আলোচনার জন্য একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। আমাদের চিফ হুইপ যেটা বলেছেন, আমাদের রীতি অনুযায়ী প্রশ্নোত্তর পর্ব ও ৭১ বিধির পরেই এ জাতীয় মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। আমার মনে হয় না কারও অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে।"
বিরোধী দলীয় চিফ হুইপের মন্তব্য
বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম মাইক নিয়ে বলেন, "সংসদ কীভাবে গঠিত হচ্ছে তা আমরা ভুলে যাচ্ছি, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট হয়েছিল। এখন সংসদের কার্যক্রম দেখলে মনে হচ্ছে, এ ধরনের কিছুই হয়নি। এটি সবচেয়ে বেশি জনগুরুত্বপূর্ণ, এ সংসদে আলোচনা হওয়া উচিত।" তিনি গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনার অনুরোধ করেন।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও শান্তি
চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম বলেন, "বিরোধী দলীয় নেতার উত্থাপিত বিষয় নিশ্চয়ই আলোচনায় আসবে, আজকেই আলোচনা হতে পারে অথবা স্পিকার যেদিন নির্ধারিত করবেন, সেদিন আলোচনা হতে পারে। ৭১ বিধি শেষে বিষয়টি উত্থাপন করতে পারেন।" ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দলীয় নেতাকে জানান, "আপনার বিধিটি আমরা দেখছি। ৭১ বিধির পরেই নোটিশটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাব।"
শফিকুর রহমান পুনরায় দাবি করেন, "আমি জেনেশুনে এ সময় এ বিষয়টি উত্থাপন করেছি। আমার জানামতে এটাই সময়। ৭১ বিধির আগে এটা উত্থাপন করার সুযোগ আছে। ৬৪ বিধি অনুযায়ী বিধিটা দেখতে পারেন।" ডেপুটি স্পিকার জবাব দেন, "৬৪ বিধিতে উল্লেখ আছে। কিন্তু সংসদের রীতি, তা চিফ হুইপ বলেছেন, সে জন্য বলেছি–নোটিশটি আমরা পেয়েছি। ৭১ বিধির শেষে নোটিশটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেব।"
অবশেষে চিফ হুইপ উল্লেখ করেন, "স্পিকার চাইলে প্রশ্নোত্তর ও ৭১ বিধি স্থগিত রেখে যে কোনো আলোচনা করতে পারেন।" স্পিকার সংসদীয় বিধি অনুসরণ করে পরবর্তী কার্যদিবসে বা নির্ধারিত সময়ে বিষয়টি আলোচনার আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। এই বিতর্কে জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।



