ঋণখেলাপি প্রার্থীদের সংসদে প্রবেশ: আইনের ফাঁক ও নির্বাচনী বিতর্ক
ঋণখেলাপি প্রার্থীদের সংসদে প্রবেশ: আইনের ফাঁক

ঋণখেলাপি প্রার্থীদের সংসদে প্রবেশ: আইনের ফাঁক ও নির্বাচনী বিতর্ক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার আগে ঋণখেলাপির তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বর্তমানে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট—এ তিন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সিলেট-১ আসন থেকে নির্বাচিত মুক্তাদিরসহ অনেকে আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হয়েছেন, যা একটি বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও আইনি জটিলতা

নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি) থেকে প্রাপ্ত তালিকা অনুযায়ী ঋণখেলাপিদের চিহ্নিত করলেও, আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে অনেক প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ স্বীকার করেছেন, ‘আমরা ঋণখেলাপি যাঁদের ছাড় দিয়েছি, মনে কষ্ট নিয়ে দিয়েছি। শুধু আইন তাঁদের পারমিট করেছে বিধায়।’ প্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২-এর ১২ নম্বর ধারা অনুযায়ী ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না, কিন্তু আইনের ফাঁক গলে অনেকে সামান্য টাকা পরিশোধ করে ঋণ নিয়মিত করে ফেলেন এবং আদালতের স্থগিতাদেশ পেয়ে নির্বাচনে অংশ নেন।

খেলাপি ঋণের বিশাল অঙ্ক ও প্রভাব

বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ডিসেম্বরের হিসাবে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এই বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণের মধ্যে অনেক প্রার্থীর নাম জড়িত, যাঁরা নির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, চট্টগ্রাম-৬ আসনের বিএনপি সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নামে ৬৭৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকার খেলাপি ঋণ ছিল, যদিও তিনি দাবি করেন নির্বাচনের আগেই ঋণ নিয়মিত হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিভিন্ন আসনের প্রার্থীদের অবস্থা

  • সিলেট-১: খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের নামে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে ৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং অন্যান্য ব্যাংকে শতাধিক কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। তিনি দাবি করেন, নির্বাচনের আগেই ঋণ নিয়মিত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাথে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই।
  • বগুড়া-১: কাজী রফিকুল ইসলাম অন্তত ৭৬৫ কোটি টাকার ঋণখেলাপি ছিলেন, কিন্তু আদালতের স্থগিতাদেশে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হয়েছেন।
  • চট্টগ্রাম-৪: মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর নামে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ থাকা সত্ত্বেও তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন এবং ফলাফল স্থগিত রয়েছে।

আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞদের মতামত

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, ‘চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সিআইবিতে খেলাপি দেখানো যাবে না—এমন আদেশ আদালত দিতেই পারেন। তবে সময়টা সীমাহীন না হওয়াই ভালো। আমি চাই, ব্যাংক থেকে বিশাল অঙ্কের টাকা নিয়ে তা ফেরত দিতে না পারা ব্যক্তিরা যত কম এমপি হতে পারেন।’ অর্থনীতিবিদ মইনুল ইসলাম এই প্রক্রিয়াকে খারাপ সিদ্ধান্ত বলে উল্লেখ করেছেন, যা ব্যাংক খাত ও অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

২০১৮ সালের নির্বাচনেও ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে প্রার্থিতা বাতিলের ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু এবার অনেক প্রার্থী আদালতের স্থগিতাদেশের সুযোগ নিয়ে সংসদে প্রবেশ করেছেন। এই অবস্থা অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যদি আইনপ্রণেতারাই ঋণ ফেরত না দেন, তাহলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হবে এবং অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।