স্বাধীনতা জাদুঘর বন্ধ: ভাঙচুরের পর অনিশ্চিত পুনরায় উদ্বোধন, কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতি
স্বাধীনতা জাদুঘর বন্ধ, ভাঙচুরের পর অনিশ্চিত উদ্বোধন

স্বাধীনতা জাদুঘর: ভাঙচুরের পর অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ, পুনরায় উদ্বোধন অনিশ্চিত

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতা জাদুঘর। ২০১৫ সালের ২৫ মার্চ, দেশের ৪৪তম স্বাধীনতা দিবসে, এই জাদুঘরটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল। তবে, ২০২৬ সালের স্বাধীনতা দিবসেও এটি তালাবদ্ধ থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, একদল বিক্ষুব্ধ জনতা ভূগর্ভস্থ এই জাদুঘরে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। সেই ঘটনার পর থেকেই অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান।

ভাঙচুরের পর অবহেলা ও বর্তমান অবস্থা

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অবস্থিত জাদুঘরের প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। কোনও কর্মকর্তা বা কর্মচারীর উপস্থিতি নেই, চারপাশে নীরবতা বিরাজ করছে এবং দর্শনার্থীদের আনাগোনা সম্পূর্ণ বন্ধ। 'স্বাধীনতা জাদুঘর' লেখা কাঁচের নামফলকটি দেয়াল থেকে সরানো হয়েছে। প্রবেশমুখে থাকা র্যাম্পটি ইটের ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে, এবং দেয়ালে 'জেন-জি ওয়ান্টস খিলাফাহ' লেখা রয়েছে।

ভাঙচুরের পর এই জাতীয় স্থাপনাটি অনেকটা অযত্নেই পড়ে আছে। হামলার সময় জাদুঘরের বাইরের দেয়ালে থাকা টেরাকোটাগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছিল, যেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুখাবয়বগুলো ধ্বংস করা হয়। সেই ভাঙা টেরাকোটার অংশগুলো দেড় বছরের বেশি সময় পরেও সেভাবেই পড়ে রয়েছে। সামনের ওয়াটার বডির পানিতে আবর্জনা জমে আছে, যা অযত্নের স্পষ্ট লক্ষণ বলে মনে করছেন অনেকে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ

নিয়মিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘুরতে যাওয়া এক যুবক, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বলেন, "রাজধানীতে পর্যাপ্ত বিনোদন কেন্দ্র নেই। স্বাধীনতা জাদুঘর ও আশপাশের এলাকা সময় কাটানোর জন্য দারুণ স্থান ছিল। এখানে আমরা ইতিহাস জানতে পারতাম এবং টেরাকোটার নজরকাড়া নকশায় মুগ্ধ হতাম। কিন্তু ৫ আগস্টের পর থেকে জাদুঘরটি বন্ধ। ভাঙা অংশগুলো এখনও সরানো হয়নি, যা অনেকটা অবহেলার পরিচয়।"

তিনি আরও যোগ করেন, "এই জাদুঘর ভাঙচুর করে রাজাকারের বংশধররা স্বাধীনতার ইতিহাস মুছে দিতে চেয়েছে। আমাদের জন্ম, ইতিহাস, গর্ব—সব কিছুতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ সরকারের কারও কোনও মাথাব্যথা নেই। প্রায় দুই বছর ধরে জাদুঘর সংস্কার করা হয়নি। স্বাধীনতা যুদ্ধ তো কোনও এক দলের নয়, এটি সব বাঙালির। আমি চাই আগামী স্বাধীনতা দিবসের আগে জাদুঘর সংস্কার করে পুনরায় উন্মুক্ত করা হোক।"

স্বাধীনতা জাদুঘরের সামনে দায়িত্বরত এক আনসার সদস্য বলেন, "এটা বন্ধ অনির্দিষ্টকালের জন্য। ৫ আগস্টের পর থেকেই এটা বন্ধ। এটার ভিতরে কিছু নেই এখন। সব ভেঙে ফেলেছে। তারপর থেকেই এটা তালাবদ্ধ। কেউ এখানে আর আসে না।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, "আমি প্রায় ৭/৮ মাস ধরে এখানে ডিউটিতে আছি। বসে থাকি। আমাকে কর্তৃপক্ষ থেকে বলা আছে, কেউ তালা ভাঙতে এলে বা কোনও কিছু ভাঙচুর করতে এলে ফোন দিয়ে জানাতে। আমি শুধু ফোন দিয়ে জানাবো, তারপর তারা ব্যবস্থা নেবে।"

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও পরিকল্পনা

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, "স্বাধীনতা জাদুঘরের বর্তমান অবস্থার বিষয়ে নতুন সরকারের কাছ থেকে অন্তত একটি নীতিগত অবস্থান বা পলিসি স্টেটমেন্ট প্রত্যাশা করা যায়। হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণাঙ্গ পুনর্নির্মাণ সম্ভব নাও হতে পারে, তবে বিষয়টি গুরুত্ব দাবি করে। নতুন সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তাই এই বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। বিগত সরকারের অবস্থানও এটার মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হয়ে গেছে। এখন দেশের দিকে তাকিয়ে সামনের পরিকল্পনা করতে হবে।"

তিনি ভাঙচুরকে সুপরিকল্পিত আক্রমণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, "এটি কোনও সাধারণ মবের কাজ ছিল না। এটি একটি ভূগর্ভস্থ জাদুঘর, যা সবার চলাচলের পথের বাইরে। একটি গোষ্ঠী সুপরিকল্পিতভাবে এটি ধ্বংস করেছে। একটি জাতির প্রতীককে তারা নষ্ট করতে চেয়েছে। তাই সরকারি তদন্ত হওয়া উচিত এবং দায়ীদের শনাক্ত করা সম্ভব।"

জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব জাদুঘর খোলার পরিকল্পনা বিষয়ে বলেন, "নতুন কনটেন্ট সাজানো নিয়ে কাজ চলছে। আশা করি এ বছরের মে-জুনের দিকে জাদুঘর পুনরায় খুলতে পারবো। আর্কিটেক্টরা ডিজাইন নিয়ে কাজ করছেন। ভাঙচুর যেসব হয়েছে, সেগুলো নতুনভাবে প্রোডাকশন করা হচ্ছে। অনেক কিছু নষ্ট হয়ে গেছে, আগের অবস্থায় ফেরানো সম্ভব নয়। তবে সংগ্রহশালায় রাখা হয়েছে। এখন সম্পূর্ণ নতুনভাবে কিউরেশন করতে হবে, যা অন্তত দুই-তিন মাস সময় লাগবে।"

ভাঙচুরের ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, "না, এখন পর্যন্ত আইনানুগ ব্যবস্থা নেই। আমরা মূলত বড় ধরনের অ্যাসেসমেন্ট করেছি—কী ক্ষতি হয়েছে, সেগুলো।"

উপসংহার

স্বাধীনতা জাদুঘরের বর্তমান অবস্থা উদ্বেগজনক। ভাঙচুরের পর প্রায় দুই বছর ধরে এটি বন্ধ রয়েছে, এবং পুনরায় উদ্বোধনের তারিখ এখনও অনিশ্চিত। কর্তৃপক্ষ মে-জুন মাসে খোলার আশা করলেও, ভাঙা টেরাকোটা ও অবহেলার চিহ্নগুলো জাতীয় স্মৃতির প্রতি গুরুত্বের অভাবই নির্দেশ করে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সংরক্ষণে দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।