খালার হোটেলে হাসনাতের স্মৃতি: নির্বাচনী বুথ থেকে নিঃশব্দ স্বীকৃতি
কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি মর্মস্পর্শী পোস্ট শেয়ার করেছেন। তিনি দেবিদ্বার পৌরসভার ভিংলাবাড়ী এলাকার দিবানিশি হোটেলের মালিক আলেয়া বেগমের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করেছেন। বুধবার (২৫ মার্চ) বিকালে এই পোস্টটি ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়, যা স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রথম পরিচয় ও হোটেলের আবিষ্কার
হাসনাত আবদুল্লাহ তার ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করেছেন যে, দেবিদ্বারের মানুষ আলেয়া বেগমকে ‘খালা’ নামে চেনে। ২০২৫ সালের শুরুতে তার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়। তিনি লিখেছেন, “২৪-এর পর যখন দেবিদ্বারে যাওয়া শুরু করি, তখন নানা কাজকর্মে খাওয়া-দাওয়ার কোনো ঠিকঠাক ছিল না। সকালে বের হতাম, গভীর রাতে বাসায় ফিরতাম, খাওয়ার ফুরসতই মিলত না।”
একদিন রাতে এক বন্ধুর পরামর্শে তিনি খালার হোটেলের সন্ধান পান। গিয়ে দেখেন, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি জীর্ণ চৌচালা ঘর। রাতের বেলা খালাকে ডেকে তুলে তারা সেখানে খাবার গ্রহণ করেন। সেদিন টমেটো দেওয়া ঘন মসুর ডাল ও ডিমভাঁজা খেয়ে তিনি অত্যন্ত তৃপ্তি লাভ করেন। সেই দিন থেকেই দেবিদ্বারে তার একটি স্থায়ী খাবারের জায়গা হয়ে ওঠে এই হোটেল।
রান্নার শৈল্পিকতা ও খালার নিষ্ঠা
হাসনাত আবদুল্লাহ খালার রান্নার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন। তিনি বর্ণনা করেছেন কীভাবে খালা মাংস রান্না করতেন: “খালা প্রথমে মাংস ধুয়ে ঝরিয়ে নিতেন, আলু কেটে রাখতেন। কড়াইতে তেল গরম হতেই গরম মসলা, তেজপাতা আর পেঁয়াজ কুচি দিয়ে নাড়তেন। পেঁয়াজ লালচে হয়ে এলে এমন গন্ধ উঠত যে বাইরে দাঁড়ানো লোকেরও ক্ষুধা বেড়ে যেত।”
তার মতে, খালার হাতের নাড়ায় একটি বিশেষ তাল ছিল, যা অভ্যাস ও অভিজ্ঞতার মিশেলে তৈরি। রান্নার সময় খালার চোখে একাগ্রতা লক্ষ্য করা যেত, যেন এটি তার ইবাদতের মতো গুরুত্বপূর্ণ। মাংসের সঙ্গে আলু ভর্তাও তৈরি করতেন তিনি, যা সরষের তেলের ঝাঁজে অনন্য স্বাদ পেত।
নির্বাচনী বুথ হিসেবে হোটেলের ব্যবহার
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো নির্বাচনের সময় খালার অবদান। হাসনাত আবদুল্লাহ লিখেছেন, “নির্বাচনের সময় সবাই যখন টাকা-পয়সা দিচ্ছিল, খালাকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম, খালা আপনি আমাকে কী দিবেন? খালা চুপ থাকলেন।”
কিছুদিন পর গিয়ে তিনি দেখেন যে খালা তার হোটেলটিকেই নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের বুথ হিসেবে দান করে দিয়েছেন। এই কারবার দেখে তিনি নিশ্চুপ হয়ে যান। নির্বাচনে জয়লাভের পর প্রথমবারের মতো খালার হোটেলে গিয়ে তিনি আগের মতোই স্নেহ ও যত্ন পেয়েছেন।
নিঃশব্দ স্বীকৃতি ও কৃতজ্ঞতা
হাসনাত আবদুল্লাহ তার পোস্টের শেষ অংশে গভীর আবেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন, তার এই জয়ের পেছনেও খালার চৌচালা ঘরটি নীরবে জড়িয়ে আছে। খালার চোখে কোনো নতুন পরিচয় নেই, তিনি এখনও সেই আগের মানুষ হিসেবে স্বীকৃত।
তিনি লিখেছেন, “হঠাৎ মনে হলো, এই নিঃশব্দ স্বীকৃতিই হয়তো সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এখানে কোনো অর্জনের হিসাব নেই, কোনো প্রমাণের প্রয়োজন নেই, আছে শুধু এক ধরনের সহজ গ্রহণ। খালার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।”
এই পোস্টটি স্থানীয় রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্কের একটি মর্মস্পর্শী দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাজনীতিবিদের আন্তরিক বন্ধনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।



