ঈদযাত্রায় ভোগান্তি ও দুর্ঘটনা: নতুন সরকারের প্রচেষ্টা ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব
ঈদযাত্রায় ভোগান্তি: সরকারের প্রচেষ্টা ও বাস্তবতা

ঈদযাত্রায় ভোগান্তি ও দুর্ঘটনা: নতুন সরকারের প্রচেষ্টা ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব

পবিত্র ঈদুল ফিতর আমাদের জীবনে শিকড়ের টানে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য উপলক্ষ। বছরের এই সময়টিতে নগরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে মানুষ ছুটে যায় গ্রামের বাড়িতে, আপনজনের কাছে। কিন্তু প্রতি বছরই এই আনন্দময় যাত্রা অনিশ্চয়তা, ভোগান্তি এবং কখনো কখনো মৃত্যুর ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এবারের ঈদযাত্রাও সেই পুরোনো বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে—তবে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে।

নতুন সরকারের পরিবর্তনের ইঙ্গিত

তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি দৃশ্যমান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দ্রুততা, প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা, সরকারি ব্যয় কমানো এবং অপ্রয়োজনীয় প্রোটোকল হ্রাস—এসব উদ্যোগ একটি ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করেছে। এমনকি ছুটির দিনেও প্রধানমন্ত্রীর নিয়মিত অফিস করা কিংবা দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছিল—ঈদযাত্রাও হয়তো এবার হবে স্বস্তিদায়ক, নিয়ন্ত্রিত এবং নিরাপদ।

বাস্তবতা: ভোগান্তির চিরচেনা চিত্র

কিন্তু বাস্তবতা সেই প্রত্যাশাকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারেনি। ঈদযাত্রার শুরুতে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও দিন যত গড়িয়েছে, ততই সামনে এসেছে চিরচেনা ভোগান্তির চিত্র।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  • বাসস্ট্যান্ডে দীর্ঘ অপেক্ষা
  • নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ পর্যন্ত আদায়
  • ট্রেনের অনিয়মিত চলাচল
  • নৌপথে বিশৃঙ্খলা

সব মিলিয়ে সাধারণ যাত্রীরা আবারও সেই পুরোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন: পরিবর্তন কোথায়?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অতিরিক্ত ভাড়া ও মন্ত্রীর আচরণ

বিশেষ করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ এবারের ঈদযাত্রায় একটি বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নির্ধারিত ভাড়ার সঙ্গে বাস্তব ভাড়ার কোনো মিল নেই। অথচ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। শেখ রবিউল আলম যখন দাবি করেন যে কোথাও অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না, তখন সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সেই বক্তব্যের একটি স্পষ্ট দূরত্ব তৈরি হয়। এই দূরত্বই জনআস্থার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মন্ত্রীসুলভ আচরণের প্রশ্ন। গাবতলী টার্মিনালে মন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে বাস চলাচল বন্ধ রাখা এবং যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় রাখার ঘটনা মানুষের মনে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তার ওপর 'ঈদের সময় একটু দেরি হতেই পারে'—মন্ত্রীর এই মন্তব্যটি জনমনে সহানুভূতির বদলে এক ধরনের উদাসীনতার বার্তা দিয়েছে। এখানে মন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করলে জনপ্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতে পারত। একটি নতুন সরকার যখন নিজেকে ভিন্ন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখন এই ধরনের আচরণ সেই প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দেয়।

দুর্ঘটনা: ভঙ্গুর পরিবহন ব্যবস্থা

আরও উদ্বেগজনক হলো দুর্ঘটনার চিত্র। রাজধানীর সদরঘাটে লঞ্চ দুর্ঘটনা, রেললাইনে ট্রেনচ্যুতি, সড়কে একের পর এক প্রাণহানি—এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে আমাদের পরিবহন ব্যবস্থা এখনো কতটা ভঙ্গুর। একদিনে ২৮ জনের মৃত্যু কিংবা কুমিল্লায় বাস-ট্রেন সংঘর্ষে বহু প্রাণহানি—এসব কেবল সংখ্যা নয়, এগুলো অসংখ্য পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি। অথচ গবেষণা বলছে, এসব দুর্ঘটনার অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য। বেপরোয়া গাড়ি চালানো, সড়কের নাজুক অবস্থা, চালকের ক্লান্তি এবং তদারকির অভাব—এই পরিচিত কারণগুলো বছরের পর বছর ধরে একই রয়ে গেছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্মৃতি ও প্রশ্ন

এই বাস্তবতার মধ্যেই একটি সত্য আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ঈদযাত্রা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত ও স্বস্তিদায়ক ছিল—এমন ধারণা জনমনে এখনো জোরালো। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—একটি অনির্বাচিত সরকার যেখানে প্রশাসনিক দৃঢ়তার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছিল, সেখানে বিপুল জনসমর্থনে নির্বাচিত একটি সরকার কেন একই সক্ষমতা দেখাতে পারছে না?

রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা বুঝতে হবে। প্রশাসন কাঠামোগতভাবে একই থাকলেও নির্বাচিত সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ ও সমন্বয়ের দায় অনেক বেশি। মাঠপর্যায়ে দলীয় প্রভাব, পরিবহন খাতের শক্তিশালী সিন্ডিকেট এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের সংস্কৃতি—এসব কারণে প্রশাসনিক কঠোরতা প্রয়োগ অনেক সময় বাধাগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার তুলনামূলকভাবে এসব চাপ থেকে মুক্ত থাকে, ফলে তারা দ্রুত এবং কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

এখানেই প্রশ্ন ওঠে যে, এই পরিস্থিতি কি শুধুই প্রশাসনিক দুর্বলতার ফল, নাকি এর পেছনে একটি সুসংগঠিত স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব কাজ করছে? পরিবহন খাতের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা বলছে, এখানে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কার্যকর রয়েছে, যারা সুযোগ পেলেই অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে। নতুন সরকার এই সিন্ডিকেট ভাঙার চেষ্টা শুরু করেছে—এটি দৃশ্যমান। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে, ফলে তার পূর্ণ সুফল পাওয়া যায়নি।

তবে একই সঙ্গে এটিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে, কিছু ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত অভিযোগের মাধ্যমে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টাও থাকতে পারে। বাস্তব সমস্যার পাশাপাশি একটি বর্ণনাগত লড়াইও এখানে সক্রিয়—যেখানে তথ্য, অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক ব্যাখ্যা একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।

সরকারের সাফল্য ও মিশ্র বাস্তবতা

এই সমালোচনার মধ্যেও সরকারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি না করা নিঃসন্দেহে একটি বড় সিদ্ধান্ত, যা সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির বার্তা বহন করেছে। একই সঙ্গে তারেক রহমান-এর ব্যক্তিগত কর্মতৎপরতা—ছুটির দিনেও অফিস করা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি—মানুষের মনে একটি ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি করেছে।

ফলে পুরো চিত্রটি একটি মিশ্র বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। একদিকে রয়েছে পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত ও নেতৃত্বের সক্রিয়তা, অন্যদিকে রয়েছে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ঘাটতি ও পুরনো কাঠামোগত সমস্যার জট।

পরিশেষে: সুশাসনের পরীক্ষা

পরিশেষে বলা যায়, ঈদযাত্রার ভোগান্তি ও দুর্ঘটনা কেবল একটি মৌসুমি সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রের সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে শুধু সদিচ্ছা নয়, প্রয়োজন কঠোর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং সমস্যাকে স্বীকার করার মানসিকতা ও মানবিকতা। কারণ, ঈদ আনন্দের প্রতীক। সুতরাং এটি কোনোভাবেই ভোগান্তি আর মৃত্যুর প্রতীকে পরিণত হতে পারে না।

লেখক: আহসান হাবিব বরুন, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।