সংবিধান সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপি-জামায়াত মতবিরোধ, অনিশ্চয়তা তৈরি
সংবিধান সংস্কারে বিএনপি-জামায়াত মতবিরোধ, অনিশ্চয়তা

সংবিধান সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপি-জামায়াত মতবিরোধ, অনিশ্চয়তা তৈরি

সংবিধান সংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকেই তীব্র মতবিরোধে জড়িয়ে পড়েছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এবং বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। এই বিরোধের ফলে আদৌ সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হবে কিনা, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশ ও গণভোটের ফলাফল অনুসারে, প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করার কথা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে।

নির্বাচন পরবর্তী প্রেক্ষাপট ও বিতর্কের সূত্রপাত

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৩ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে নির্বাচন কমিশন ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করে। বিধি অনুযায়ী, ১৫ মার্চের মধ্যে রাষ্ট্রপতির সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার কথা ছিল। ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতারা বিষয়টিকে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে চাইলেও, বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপি রাষ্ট্রপতির আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। এই দ্বন্দ্বের ফলে একটি বিতর্কময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

জুলাই জাতীয় সনদে আদেশ ও সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে গণভোটে রায় এসেছিল। এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংবিধান সংস্কার পরিষদের উপর ন্যস্ত। সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই সনদ প্রণয়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন খাত, বিশেষ করে সংবিধানের মৌলিক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু সরকার ও বিরোধী দলের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে তা জটিলতায় রূপ নিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও দলগুলোর অবস্থান

বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, "বিএনপি আপাতত এ বিষয়টি এখনই মেনে নেবে না। তারা এ নিয়ে সংসদেই আলোচনার কথা বলবে। দীর্ঘ আলোচনার পর যদি তারা আগ্রহী হয়, তাহলে হয়তো সংবিধান পরিষদ গঠনের দিকে যাবে। যেহেতু তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়েছে, তাই বিষয়টি সংসদে সুরাহার সিদ্ধান্ত হলে তারা লাভবান হবে।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিশেষ করে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া বিষয়গুলো বিএনপি পাশ কাটিয়ে যেতে চাইতে পারে।

অপরদিকে, জামায়াত ও এনসিপি সংসদে উত্তাপ ছড়াতে চাইবে এবং দাবি পূরণ না হলে রাজপথে নামার হুমকি দিচ্ছে। সাইফুল হক বলেন, "এসব দিক বিবেচনা করলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টি এখনই সমাধান হবে কিনা বলা যাচ্ছে না।"

সংবিধান সংস্কার পরিষদের গঠন প্রক্রিয়া ও আদেশের বিধান

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন হওয়ার কথা। আদেশে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান সম্পর্কে বলা আছে, সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের পদ্ধতিতে পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করতে বাধ্য।

ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের অনড় অবস্থান

গণভোটের রায় ও রাষ্ট্রপতির আদেশ অনুসারে, সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের প্রথম দিনেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্র এনসিপির সদস্যরা। কিন্তু ক্ষমতাসীন বিএনপির সদস্যরা তা মেনে নেননি, তারা বিদ্যমান সংবিধানের বাইরে যেতে অনিচ্ছুক এবং সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে চান।

বিএনপি জুলাই সনদের ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবের মধ্যে ৩০টিতে ঐকমত্য দেখালেও, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো, উচ্চকক্ষ গঠন ও সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা, ন্যায়পাল ও দুর্নীতি দমন কমিশনের নিয়োগের মতো প্রস্তাবগুলিতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে আসছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, "১৫ মার্চ সরকারের ৩০ দিন পূর্ণ হবে। এর মধ্যে যদি সরকার জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার ব্যবস্থা না করে, তাহলে তারা জাতির কাছে ক্ষমা পাবে না।"

সম্ভাব্য পরিণতি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

সরকার ও বিরোধী দলের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী রতন বলেন, "সংবিধান সভা করার বিষয়টি সংবিধানে নেই, তবে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার আলোকেই দলগুলো ঐকমত্য হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিএনপিকেই সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।"

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান বলেন, "সংস্কার বাস্তবায়নের জন্যই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করেছে দেশের মানুষ। তাই সরকারের তা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।" অন্যদিকে, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, "বিএনপিও সংস্কারের পক্ষে, তবে সংবিধান অনুযায়ী আমরা সিদ্ধান্ত নিতে চাই। এ বিষয়ে প্রয়োজনে সংসদে আলোচনা হবে।"

এই বিরোধ ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই আগামী দিনে সংবিধান সংস্কারের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।