জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সংসদে বিতর্ক, নাগরিকদের উদ্বেগ
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সংসদে বিতর্ক

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সংসদে উত্তপ্ত বিতর্ক

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে জাতীয় সংসদে চলমান বিতর্ক রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। নাগরিকদের মধ্যে এই ইস্যু নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জাতীয় সংসদে আলাপ-আলোচনা ও তর্কবিতর্কের মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত।

ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্তাপ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক তৈরি হবে, তা আগে থেকেই অনুমান করা হচ্ছিল। ১২ মার্চ প্রথম দিনের বৈঠকে রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় বিরোধী দলের ওয়াকআউটের পর দ্বিতীয় দিন রোববার সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষে-বিপক্ষে তীব্র বাহাস হয়েছে। দ্বিতীয় দিনের বৈঠকের পর বিরোধী দল স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সংসদের ভেতরে যদি জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন না ঘটে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই রাজপথে নামতে হবে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপ কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

সরকারি ও বিরোধী দলের অবস্থান

প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে নির্ধারিত সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করায় সংসদে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। এর জবাবে সরকারি দলের জ্যেষ্ঠ নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় রাষ্ট্রপতি এ পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেননি। দুই পক্ষের এই বিতর্কের মধ্যে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত না দিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, জনগুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়ে নোটিশ পাওয়ার পর তিনি সিদ্ধান্ত জানাবেন।

জুলাই সনদের পটভূমি ও বর্তমান বিতর্ক

অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিতে জুলাই সনদ চূড়ান্ত করেছিল। নোট অব ডিসেন্টসহ বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছিল। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান পরিষদ গঠিত হওয়ার কথা ছিল। এ ছাড়া নির্বাচনে জয়ী ব্যক্তিদের একই সঙ্গে সংসদ সদস্য হিসেবে ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা ছিল। সংবিধানে সংবিধান সংস্কান পরিষদের অস্তিত্ব নেই—এ যুক্তিতে বিএনপির নির্বাচিত সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।

আইনি প্রশ্ন ও গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা

এটা সত্যি যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেখানে আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটাও অস্বীকারের কোনো উপায় নেই যে চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক পথে নিয়ে যাওয়ার যে সুযোগ তৈরি করে দেয়, তার ধারাবাহিকতাতেই গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। একটি সুষ্ঠু, পরিচ্ছন্ন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নির্বাচিত সংসদ ও জনপ্রতিনিধিদের ওপর জনগণের প্রত্যাশা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। নাগরিকেরা প্রত্যাশা করেন, বাংলাদেশের রাজনীতি পুরোনো ধারা থেকে বেরিয়ে আসবে। রাজপথ নয়, জাতীয় সংসদ হবে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।

ভবিষ্যতের দিকে নজর

ঈদের ছুটি শেষে সংসদের পরবর্তী বৈঠক বসবে ২৯ মার্চ। আমরা আশা করি, সরকারি দল ও বিরোধী দল দুই পক্ষই সংবিধান, আইনকানুন ও গণ–অভ্যুত্থানের জন–আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে এবং আইনপ্রণেতারা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক অবসানের একটি পথ বের করবেন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংসদীয় আলোচনাই এই সংকট সমাধানের সর্বোত্তম উপায় হতে পারে।