রাষ্ট্রপতির ভাষণে ৫০ ঘণ্টার আলোচনা: সংসদে বিতর্ক ও অর্থের অপচয় নিয়ে প্রশ্ন
রাষ্ট্রপতির ভাষণে ৫০ ঘণ্টার আলোচনা, বিতর্ক ও অর্থের অপচয়

রাষ্ট্রপতির ভাষণে ৫০ ঘণ্টার আলোচনা: সংসদে বিতর্ক ও অর্থের অপচয় নিয়ে প্রশ্ন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের দেওয়া ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টা আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কার্য উপদেষ্টা কমিটি। গত ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতির বক্তব্য শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন ও স্লোগান দিয়ে বিরোধী দলীয় জোটের সংসদ সদস্যরা কক্ষ ত্যাগ করলেও, রাষ্ট্রপতি হট্টগোলের মধ্যে তার বক্তব্য প্রদান করেন। প্রধান বিরোধী দলের সদস্যরা যে বক্তব্য শুনতে চাননি, সংসদীয় রীতি অনুযায়ী এখন সেই ভাষণের ওপরই সংসদে আলোচনা হবে দীর্ঘ ৫০ ঘণ্টা! সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেহেতু তার বক্তব্য নিয়ে আপত্তি ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে— সেই বক্তব্য নিয়ে এত সময় ধরে আলোচনা করে সংসদের খরচ বাড়ানোর মানে হয় না।

কার্য উপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্ত ও অধিবেশনের সময়সূচি

শনিবার (১৪ মার্চ) স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন চলবে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। রবিবার (১৫ মার্চ) ও সোমবার (১৬ মার্চ) অধিবেশন চলার পর তা মুলতবি হয়ে আবার ২৯ মার্চ বসবে। এই সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর মোট ৫০ ঘণ্টা সাধারণ আলোচনা হবে। এছাড়া ১৩৩টি অধ্যাদেশের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন এবং ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নিয়ে আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়েছে বৈঠকে। বৈঠকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে বিতর্ক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ

বিরোধী দল যে বক্তব্যের জেরে ‘ওয়াকআউট’ করেছেন, সেই ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টা আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। হিসাব করলে দেখা যায়, এতে করে একেকজন সংসদ সদস্য ১২ মিনিট করে কথা বলতে পারবেন। তার মানে, সর্বোচ্চ ১২০০ শব্দ উচ্চারণ করতে পারবেন তারা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) রিপোর্ট অনুসারে, ১১তম সংসদের প্রথম ২২ অধিবেশনের (জানুয়ারি ২০১৯ থেকে এপ্রিল ২০২৩ পর্যন্ত) পর্যালোচনায় দেখা যায়, সংসদীয় কার্যক্রমে প্রতি মিনিটে ব্যয় হয় গড়ে ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা। দশম সংসদ (২০১৪–১৮) চলাকালে খরচ হতো প্রতি মিনিটে প্রায় ১ লক্ষ ৬৩ হাজার টাকা। এই খরচে সংসদ সদস্যদের পারিশ্রমিক, কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা, বিল-ভাড়া, বিদ্যুৎ, পানি, নিরাপত্তা ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত থাকে। এই হিসেবে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনায় রাষ্ট্রের বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ হবে। সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলছেন, যে ভাষণ নিয়ে খোদ সংসদে আপত্তির ঝড় উঠেছে, তার পেছনে এত সময় ও অর্থের ব্যয় কতটুকু যৌক্তিক।

বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক মন্তব্য

রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনার বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বর্তমান রাষ্ট্রপতি বিগত দিনে ফ্যাসিস্টের দোসর ছিল। তাই সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে তার ভাষণের সময় আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছি। এখন কার্য উপদেষ্টার বৈঠকে তার ভাষণের ওপর আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি রেওয়াজের দোহাই দিয়ে ফ্যাসিস্টকে নরমালাইজড করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “রাষ্ট্রপতির ভাষণকে ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই। আমরা আলোচনায় অংশগ্রহণ করলেও ফ্যাসিবাদের সব অপকর্ম তুলে ধরবো।” রাষ্ট্রপতির বক্তব্যর ওপর কী ধরনের আলোচনা হয় জানতে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলামকে একাধিকবার কল ও মেসেজ করলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

আইনি বাধ্যবাধকতা ও সংসদীয় রীতি

সংবিধানের ৭৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বছরের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর সংসদে সাধারণ আলোচনা ও ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর দীর্ঘ আলোচনায় অংশ নেন, যেখানে সাধারণত সরকারের নীতি, কর্মপরিকল্পনা ও বিভিন্ন খাতের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে মতামত তুলে ধরা হয়। উল্লেখ্য, গত ১২ মার্চ উদ্বোধনী অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিতে দাড়ালে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা তাকে ‘জুলাইয়ের গাদ্দার’ আখ্যা দিয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে স্লোগান দেয়। রাষ্ট্রপতি যাতে বক্তব্য না দেন, চিৎকার করে সেই দাবি জানান তারা। পরে রাষ্ট্রপতি ভাষণ শুরু করলে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা প্লাকার্ড প্রদর্শনের পাশাপাশি জুলাইয়ের বিভিন্ন স্লোগান দিতে দিতে অধিবেশন কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। হট্টগোলের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি তার ভাষণ সম্পন্ন করেন।