ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ভাষণে উত্তপ্ত বিতর্ক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার দিনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণটি রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ২০২৬ সালের ১২ মার্চ সংসদ ভবনে প্রদত্ত এই ভাষণে তিনি পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনকে ফ্যাসিবাদী হিসেবে উল্লেখ করেন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে গণতন্ত্রের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলে বর্ণনা করেন।
রাষ্ট্রপতির অবস্থানের আমূল পরিবর্তন
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন একটি বিরল উদাহরণ তৈরি করেছেন, কারণ তিনি তিন বছরের মধ্যে তিনটি ভিন্ন সরকারের সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন এবং প্রতিটি সরকারের প্রশংসা করে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, কিন্তু ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় তাঁর পদে বহাল থাকেন। বর্তমানে বিএনপি সরকারের অধীনেও তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এই ভাষণে, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ করেন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন ভূমিকাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। এটি তাঁর পূর্বের অবস্থানের সাথে তীব্র বৈপরীত্য প্রদর্শন করে, কারণ ২০২৪ সালে তিনি দ্বাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিএনপি ও জামায়াতের সমালোচনা করেছিলেন এবং তখন তাঁর ভাষণ শেষ করেছিলেন জয় বাংলা বলে। এবার তিনি বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বলে বক্তব্য সমাপ্ত করেন।
সংসদে প্রতিক্রিয়া ও বিক্ষোভ
রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ বিএনপির সংসদ সদস্যদের টেবিল চাপড়ে সমর্থন করতে দেখা যায়। তবে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ওয়াকআউট করে সংসদ কক্ষ ত্যাগ করে। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন, যা সংসদীয় প্রক্রিয়ায় উত্তেজনা সৃষ্টি করে।
জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান রাষ্ট্রপতিকে ফ্যাসিস্টের দোসর ও খুনির দোসর হিসেবে আখ্যায়িত করে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যাবাদী হওয়ার অভিযোগ তোলেন। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও রাষ্ট্রপতির ভাষণের তীব্র সমালোচনা করেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন
সাধারণত, রাষ্ট্রপতির ভাষণ সরকার বা মন্ত্রিসভা প্রস্তুত করে এবং রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পাঠ করেন। কিন্তু এবারের ভাষণটি একটি ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রদত্ত হয়েছে, যেখানে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। এই প্রেক্ষাপটে, প্রশ্ন উঠেছে যে রাষ্ট্রপতির ভাষণে কি কেবল সরকারের লেখা বক্তব্য থাকবে, নাকি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদধারীর নিজস্ব অবস্থানের প্রতিফলনও থাকবে।
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ব্যক্তিগত ইতিহাসও বিতর্কের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ছিল এবং পরে এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যুক্ত ছিলেন। এই বিষয়গুলো তাঁর রাষ্ট্রপতি পদে নিযুক্তি নিয়ে শুরু থেকেই আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কারণে মো. সাহাবুদ্দিন বর্তমানে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে রয়েছেন, কিন্তু বিএনপি সরকার কত দিন তাঁকে এই পদে রাখবে তা অনিশ্চিত। সংসদ বসার আগেই এনসিপি তাঁর অভিশংসনের দাবি তুলেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বিষয়ে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, যেখানে কিছু ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির পূর্বের অবস্থানের সাথে বর্তমানের বৈপরীত্য নিয়ে মন্তব্য করেছেন।
ত্রয়োদশ সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে বহু প্রাণের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর, এবং রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে। রাষ্ট্রপতির ভাষণটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যা ভবিষ্যত সংসদীয় প্রক্রিয়ার উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
