মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ত্রয়োদশ সংসদের স্পিকার নির্বাচিত
হাফিজ উদ্দিন আহমদ ত্রয়োদশ সংসদের স্পিকার নির্বাচিত

মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ত্রয়োদশ সংসদের স্পিকার নির্বাচিত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার পদে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ভোলা–৩ আসনের সংসদ সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় এ অধিবেশন শুরু হয় এবং স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর হাফিজ উদ্দিন আহমদকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে দুপুর ১২টার পরে এই শপথ অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর বিএনপি সরকার গঠন করলে হাফিজ উদ্দিন সেখানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী হয়েছিলেন, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন

হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ১৯৪৪ সালের ২৯ অক্টোবর ভোলার লালমোহনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মরহুম ডা. আজহার উদ্দিন আহমদ পাকিস্তান জাতীয় সংসদের সাবেক সদস্য এবং মা মরহুমা করিমুন নেছা বেগম গৃহিণী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হাফিজ উদ্দিন আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৪ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন, যা তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা তুলে ধরে।

সামরিক জীবন ও মুক্তিযুদ্ধে অবদান

হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ১ ডিসেম্বর ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হন এবং ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য তিনি বীরত্বসূচক রাষ্ট্রীয় খেতাব বীর বিক্রম লাভ করেন। ৩১ জুলাই ১৯৭১, তিনি ১ম ইস্ট বেঙ্গলের কামালপুর বিওপি আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে আহত হন, যা তাঁর সাহসিকতার প্রমাণ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ যশোর ক্যান্টনমেন্টে ১ম ইস্ট বেঙ্গলের তরুণ অফিসার হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং আট ঘণ্টাব্যাপী সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন, একপর্যায়ে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দুই শ সৈনিকসহ ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসেন। তিনি যশোর-খুলনা অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করেন এবং এপ্রিল ও মে মাসে বেনাপোল অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। একমাত্র অফিসার হওয়ার সুবাদে তিনি এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত ১ম ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন। মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে ১ম ইস্ট বেঙ্গল সিলেট শহর দখল করে। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ১০ ঘণ্টা যুদ্ধের পর এমসি কলেজের রণাঙ্গনে ক্যাপ্টেন হাফিজের নেতৃত্বাধীন ‘বি’ কোম্পানি পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে, যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

রাজনৈতিক জীবন

হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ভোলা-৩ (লালমোহন ও তজমুদ্দিন) আসন থেকে সাতবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন (৩য়, ৪র্থ, ৫ম, ৬ষ্ঠ, ৭ম, ৮ম ও ১৩তম সংসদ)। ১৯৯১ সালে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হন এবং ১৯৯২ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বিএনপির মন্ত্রিসভায় ১৯৯৬ সালে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী এবং ২০০১ সালে পানিসম্পদ, বাণিজ্য ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বাড়িয়েছে।

খেলাধুলায় সাফল্য

হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম খ্যাতনামা ফুটবলার ছিলেন। ১৯৬৭-১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান জাতীয় দলের সদস্য হয়ে ইরান, তুরস্ক ও বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) সফর করেন। ১৯৭০ সালে তেহরানে অনুষ্ঠিত আরসিডি প্রতিযোগিতায় তিনি জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন। ২০০৫ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফা তাঁকে বিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের সেরা ফুটবলার হিসেবে সেন্টেনারি অর্ডার অব মেরিট সম্মাননা দেয়। তিনি জনপ্রিয় দল ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিংয়ের সদস্য হিসেবে ১২ বছর বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯৭৬ সালে দলে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া, তিনি ১৯৬৪-৬৬ সালে প্রাদেশিক প্রতিযোগিতায় ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড়ে পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুততম মানবের পদক লাভ করেন, যা তাঁর বহুমুখী প্রতিভা প্রদর্শন করে।

পারিবারিক জীবন

হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের স্ত্রী দিলারা হাফিজ শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন এবং ইডেন মহিলা কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা দপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁদের পরিবারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে আছেন। তাঁরা হলেন শাহরুখ হাফিজ, শামামা শাহরীন হাফিজ ও তাহারাত হাফিজ, যা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের একটি অংশ।