অগ্নিঝরা মার্চ: স্বাধীনতার মাসের ৫৫ বছর পূর্তি
১৯৭১ সালের মার্চ মাস বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অগ্নিঝরা অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। এই মাসটি আমাদের রোমহর্ষক রাজনৈতিক সংগ্রামের জ্বলন্ত সাক্ষী, যেখানে উত্তাল জনসমুদ্র, স্বাধীনতার প্রথম পতাকা উত্তোলন এবং অনলবর্ষী ভাষণে উচ্চারিত হয়েছিল ‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’। মার্চ মানেই পাকিস্তানি বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এবং পঁচিশে মার্চের নৃশংস গণহত্যা, যা স্বাধীনতার যুদ্ধের সূচনা করে।
৭ মার্চের ভাষণ: একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। এই ভাষণে তিনি ২৩ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রামের নির্যাস উপস্থাপন করেন, যদিও সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়নি। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’—এই বাণী সমগ্র জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিতে উদ্বুদ্ধ করে। ২০১৭ সাল থেকে এই ভাষণ ইউনেসকোর বৈশ্বিক প্রামাণ্য ঐতিহ্যের অংশ, যা তার আন্তর্জাতিক গুরুত্ব underline করে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস: রাজনৈতিক বাইনারি ও চ্যালেঞ্জ
মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের মহিমান্বিত সময়, কিন্তু রাজনৈতিক বাইনারির কারণে এর ‘গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ’ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ক্ষমতার পালাবদলে ইতিহাস পুনর্নির্মিত হয়েছে, যা স্বাধীনতাবিরোধী চক্রকে বিকৃত ইতিহাস প্রচারের সুযোগ দিয়েছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সমরনায়ক ছিলেন, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এই ভূমিকা প্রায়ই উপেক্ষিত। নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দলনিরপেক্ষভাবে সংরক্ষণ করা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পাঠ নিশ্চিত করা।
নতুন রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের দর্শন
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির জয় মুক্তিযুদ্ধের স্পিরিটে জনগণের আকর্ষণের প্রতিফলন। তবে, আদর্শিক ও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে নতুন ধরনের রাজনীতির প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি রাজনৈতিক জনযুদ্ধ, যার দর্শন সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের উপর ভিত্তি করে। এই দর্শনকে রক্ষা করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, যা দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে অগ্নিঝরা মার্চের ইতিহাসকে বিবেচনা করার মাধ্যমে সম্ভব।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দায়িত্ব
৫৫ বছর সময় ইতিহাসে কম হলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এর পার্থক্য বিশাল। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো ক্রিটিক্যাল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জন-ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা, যাতে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক বার্তা সংরক্ষিত থাকে। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ভাষায়, ‘স্বাধীনতা, সে আমার—স্বজন, হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন’—এই স্বজনকে ভুলে না যাওয়া নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক দর্শন সুরক্ষিত রাখা এবং মার্চ মাসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্বীকার করা বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার জন্য অপরিহার্য। রাজনীতিকদের উচিত সব মতপথের ঊর্ধ্বে গিয়ে এই সত্য উপলব্ধি করা, নতুবা বাংলাদেশপন্থী রাজনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
