বুয়েট ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক স্লোগান নিয়ে তীব্র বিক্ষোভ, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর জবাব
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ক্যাম্পাসে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর উপস্থিতিতে রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে শিক্ষার্থীরা তীব্র বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। গত বুধবার রাতে বুয়েট শহীদ মিনারের সামনে জড়ো হয়ে শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও প্রতিবাদের কারণ
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, গত সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তাঁর নিয়মিত তারাবিহ ও জনসংযোগ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বুয়েট কেন্দ্রীয় মসজিদে নামাজ আদায় করতে আসেন। তবে নামাজ শেষে তাঁর উপস্থিতিতে রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়া হয়, যা বুয়েটকে অরাজনৈতিক ক্যাম্পাস হিসেবে ধরে রাখার অঙ্গীকারের পরিপন্থী বলে তারা মনে করেন।
শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, 'আবরার ফাহাদ ও সাবেকুন্নাহার সনির মতো দুইজন মেধাবী ও দেশপ্রেমিক শিক্ষার্থীর প্রাণের বিনিময়ে আমরা বুয়েটে একটি অরাজনৈতিক ক্যাম্পাস অর্জন করেছি।' তাদের মতে, ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এই অর্জনকে হুমকির মুখে ফেলছে।
আবরার ফাইয়াজের বক্তব্য ও সামাজিক মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া
এদিকে, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর উপস্থিতিতে রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ছাত্রলীগের হাতে নিহত আবরার ফাহাদের ভাই আবরার ফাইয়াজ। ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, 'বুয়েটের আজকের এই ছাত্র-রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস দুটো জীবনের বিনিময়ে পাওয়া, শত শত পোলাপানের নিজেদের ক্যারিয়ারের চিন্তা না করে দিন-রাত এক করে দেওয়া শ্রমের ফল।'
আবরার ফাইয়াজ আরও প্রশ্ন তোলেন, 'আমি জানি না, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ভাই জানতেন কি না যে বুয়েট এরিয়া কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের জায়গা নয়। ওনার এখানে এসে লাভ কী হলো, তা–ও জানি না। কিন্তু উনি এসে ঠিক কতটা ক্ষতি যে আমাদের করলেন, তা বুঝতে দীর্ঘ সময় লাগবে।' তিনি জোর দিয়ে বলেন, নামাজ পড়তে আসা সমস্যা নয়, কিন্তু নামাজের পরে স্লোগান বা মিছিল দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর জবাব ও বর্ণনা
আবরার ফাইয়াজসহ বুয়েট শিক্ষার্থীদের এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ফেসবুকে এক পোস্টে জবাব দিয়েছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি লিখেছেন, 'আজ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)–এর কয়েকজন ভাইয়ের আমন্ত্রণে সেখানে তারাবিহর নামাজ আদায় করতে যাই। নামাজে যাওয়ার পর একজন এসে জানান, অরাজনৈতিক ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের বক্তব্য দেওয়া যাবে না। আমি সঙ্গে সঙ্গে তা মেনে নিয়ে বলি, তারাবিহর নামাজ আদায় করে চলে যাব।'
ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনায় পাটওয়ারী আরও উল্লেখ করেন, 'নামাজ শেষে বের হওয়ার সময় আবারও আমাকে কিছু না বলার জন্য স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় এবং মিডিয়া ব্রিফিং না করার অনুরোধ জানানো হয়। আমি সেটিও সম্মানের সাথে গ্রহণ করি। সেখানে আমি শুধু শহীদ আবরার ফাহাদ এবং শহীদ ৫৭ সেনা কর্মকর্তার রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করি।'
তিনি দাবি করেন, পরবর্তীতে পলাশীতে এসে প্রেস ব্রিফিং করি এবং সবার সঙ্গে কথা বলি। এ সময় কয়েকজন ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগান দিলে তিনি নিজেই তাদের থামিয়ে দেন। পাটওয়ারীর এই বক্তব্যে তিনি নিজেকে নিরপেক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং ক্যাম্পাসের নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করেছেন বলে জানান।
বুয়েটের অরাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে চলমান বিতর্ক
এই ঘটনা বুয়েটের অরাজনৈতিক ক্যাম্পাস নীতিকে কেন্দ্র করে একটি বড় বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। শিক্ষার্থীরা দাবি করছেন যে, অতীতের বেদনাদায়ক ঘটনার পর তারা অরাজনৈতিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন, যা এখন হুমকির মুখে। অন্যদিকে, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তাঁর কর্মসূচিকে ধর্মীয় ও সামাজিক আয়োজন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এই ঘটনায় বুয়েট প্রশাসনের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনো জানা যায়নি। তবে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও সামাজিক মাধ্যমের আলোচনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ক্যাম্পাসের অরাজনৈতিক চরিত্র রক্ষায় তাদের সচেতনতা অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনা এড়াতে সকল পক্ষের সতর্কতা ও সমঝোতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
