সংসদীয় সার্বভৌমত্ব: বিতর্ক ও বাস্তবতা
জাতীয় সংসদের অধিবেশন নিয়ে প্রায়ই রাজনীতিবিদরা দাবি করেন যে সংসদ সার্বভৌম। বিশেষ করে সংসদ সদস্যরা দলমত-নির্বিশেষে এই দাবি তুলে থাকেন, যার মাধ্যমে তারা সংসদের সর্বময় ক্ষমতা ও গুরুত্বের ওপর জোর দিতে চান। তবে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ নিয়ে দ্বিমত রয়েছে, এবং আদালতের রায়ও এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবুও সংসদ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত।
সার্বভৌমত্বের উৎপত্তি ও ধারণা
সংসদীয় সার্বভৌমত্বের মূলকথা হলো এর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। অনেকের মতে, ষোড়শ শতাব্দীর শুরুর দিকে গির্জার ওপর পার্লামেন্টের আইনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের লক্ষ্যেই এর উৎপত্তি ঘটে। আবার অন্যদের মতে, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে রাজা নির্ধারণ ও বিতাড়নের সংসদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এটি বিকশিত হয়। সার্বভৌমত্ব বলতে বোঝানো হয় সংসদের আইন প্রণয়ন, সংশোধন ও রহিত করার ক্ষমতা, যা কোনো আদালত বাতিল করতে পারে না। এ ধারণা অনুসারে, সংসদ তার পূর্বসূরির সিদ্ধান্ত বা লিখিত সংবিধান মানতে বাধ্য নয়, ফলে নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভার ওপর সংসদে পাস করা আইনের নিরঙ্কুশ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
ব্রিটিশ মডেল ও ডাইসির তত্ত্ব
ব্রিটিশ সংবিধানবিশেষজ্ঞ অ্যালবার্ট ডাইসি তাঁর ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য ল অব দ্য কনস্টিটিউশন গ্রন্থে সংসদীয় সার্বভৌমত্ব তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তিনি দাবি করেন যে যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্টের আইন প্রণয়নের অধিকার রয়েছে। ব্রিটেনে লিখিত সংবিধান না থাকায় এবং ঐতিহাসিকভাবে হাউস অব লর্ডস আইনসভা ও বিচারিক ভূমিকা একত্রে পালন করায়, সেখানে এই ধারণা বিকশিত হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ ধারণা দুর্বল হয়েছে, এমনকি ব্রিটেনেও। ডাইসি নিজেও পরবর্তীতে সংসদের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতি দেন এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরাসরি জনগণের মতামত গ্রহণের পক্ষে মত দেন। এর ধারাবাহিকতায় ব্রিটেনে ব্রেক্সিট প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
লিখিত সংবিধান ও আদালতের ভূমিকা
লিখিত সংবিধান না থাকায় ব্রিটেনে সংসদীয় সার্বভৌমত্ব সীমিত অর্থে প্রযোজ্য হলেও, লিখিত সংবিধানসমৃদ্ধ রাষ্ট্রে এটি আক্ষরিক অর্থে গ্রহণযোগ্য নয়। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চের একটি মতামত এ প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য। ১৯৬৫ সালের কেশব সিংহ মামলায় আদালত বলেন, সংসদের অগাধ ক্ষমতা থাকলেও তা সংবিধানের সীমার মধ্যে প্রয়োগ করতে হবে। লিখিত সংবিধান পরিচালিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবিধানই সর্বোচ্চ ও সার্বভৌম। ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট যে সার্বভৌমত্ব দাবি করতে পারে, ভারতে কোনো সংসদ আক্ষরিক অর্থে তা দাবি করতে পারে না। রাজা রামপাল বনাম স্পিকার মামলার রায়েও একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত হয়, যেখানে বিচারপতি রাভিন্দ্রান স্পষ্ট করেন যে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের মতো ভারতীয় পার্লামেন্ট সার্বভৌম নয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
আমাদের আদালতেরও একই অভিমত রয়েছে। ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্টের ফুলকোর্ট বেঞ্চ মত দেন যে জাতীয় সংসদ সার্বভৌম নয়। কেউ কেউ যুক্তি দেন যে যেহেতু সংসদ সংবিধান সংশোধন করতে পারে, তাই সংসদই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তবে এ ধারণাও সঠিক নয়, কারণ সংবিধানে প্রদত্ত ক্ষমতার ভিত্তিতেই সংসদ সংশোধন করতে পারে, এবং তা নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের বিধান রয়েছে, এবং ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং সেই ক্ষমতার প্রয়োগ সংবিধানের অধীনেই কার্যকর হবে। অর্থাৎ, সংবিধান জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি হিসেবে প্রতিনিধিদের সীমিত ক্ষমতা প্রদান করে, এবং গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে।
সংসদের গুরুত্ব ও শুদ্ধাচার
সার্বভৌম না হলেও সংসদ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। আইন প্রণয়ন, বিদ্যমান আইন সংশোধন বা রহিতকরণ, নীতি নির্ধারণে বিতর্ক, বাজেট ও আর্থিক প্রস্তাব অনুমোদন, এবং স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ সংসদের মৌলিক দায়িত্ব। নবগঠিত ত্রয়োদশ সংসদকে এসব দায়িত্ব পালনে কার্যকর ও শুদ্ধাচারনির্ভর হতে হবে। শুদ্ধাচার নিশ্চিত করতে সংসদ সদস্যদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন জরুরি, যাতে আয় ও সম্পদের হিসাব প্রদান এবং স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা যায়। কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণের আস্থা পুনর্গঠন সম্ভব, এবং ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে জনস্বার্থে দায়িত্ব পালনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট না নেওয়ার ঘোষণা জনমনে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
সংসদের বিশেষ অধিকার ও দায়িত্ব
সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদে সংসদ ও সদস্যদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তির বিধান রয়েছে। এ ধারার অধীন গঠিত স্থায়ী কমিটির কাজ শুধু সুবিধা নিশ্চিত করা নয়, বরং সদস্যদের অনৈতিক আচরণে সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হলে ব্যবস্থা নেওয়া। ভারতে অর্থের বিনিময়ে প্রশ্ন তোলার অভিযোগে একাধিক সদস্যকে বহিষ্কার করার নজির রয়েছে। আমাদের দেশেও সংসদের মর্যাদা রক্ষায় বিশেষ অধিকার-সংক্রান্ত কমিটিকে সক্রিয় করা জরুরি। নির্বাচনী অঙ্গনকে পরিচ্ছন্ন রাখতে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে এর বিকল্প নেই।
