জামায়াত নেতা রফিকুল ইসলামের বক্তব্য: পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার ও নির্বাচনে দলীয় অবস্থান
জামায়াত নেতার বক্তব্য: পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার চান

জামায়াত নেতা রফিকুল ইসলাম খানের বক্তব্য: পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার ও নির্বাচনী প্রসঙ্গ

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান সম্প্রতি এক আলোচনা সভায় গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন। তিনি দাবি করেন যে, গত নির্বাচনে কীভাবে জামায়াতকে হারানো হয়েছে, তা গোটা দেশের মানুষ জানে। তার মতে, ভোট পড়েছে দাঁড়িপাল্লায়, কিন্তু পাস করানো হয়েছে অন্যজনকে।

আদর্শবাদী শক্তির স্থায়িত্ব ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান

রফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘কোনো আদর্শবাদী শক্তিকে দমন-পীড়ন, হত্যাকাণ্ড বা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে নিশ্চিহ্ন করা যায় না।’ তিনি উল্লেখ করেন যে, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মতো পরিকল্পিতভাবে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে হত্যা করে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে জামায়াত শেষ হয়ে যায়নি; বরং বাংলাদেশের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে গত নির্বাচনে আবির্ভূত হয়েছে।

পিলখানা হত্যাকাণ্ড: একটি নারকীয় ঘটনার বিচার দাবি

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের মর্মান্তিক ঘটনার বিচারের দাবি এবং শহীদদের স্মরণে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে পল্টনস্থ কার্যালয়ে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।

রফিকুল ইসলাম খান বলেন, পিলখানায় যে নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল, তাকে শুধু সাধারণ হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, এই হত্যাকাণ্ড কেন ঘটানো হয়েছিল। তার মতে, মহান মুক্তিযুদ্ধে মাত্র ৪-৫ জন সেনা কর্মকর্তা শহীদ হয়েছিলেন, এবং মেজর জেনারেল বা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা নিহত হননি। কিন্তু পিলখানায় দুদিনব্যাপী ডালভাত কর্মসূচির নামে ঠান্ডা মাথায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে।

সরকার ও সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘ডালভাত কর্মসূচিতে এই ৫৭ জন কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন না। তবুও তাদের হত্যা করা হয়েছে।’ রফিকুল ইসলাম খান প্রশ্ন করেন, দুদিনব্যাপী পরিচালিত হত্যাকাণ্ডের সময় সরকার কী করেছিল? নিহতদের পরিবারের আর্তনাদ যখন আকাশে-বাতাসে ভাসছিল, তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মুচকি হাসছিলেন। তিনি বলেন, ‘ওনার দায়িত্ব কী ছিল? তৎকালীন সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদ-এর ভূমিকা কী ছিল?’

তার মতে, এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধান উভয়েই এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, ‘তারা জড়িত না থাকলে একজন মানুষের জীবনের কি কোনো দাম নেই?’ ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবেও তিনি মন্তব্য করেন যে, ডালভাতের সমস্যার জন্য কাউকে হত্যা করতে হয় না। তিনি বলেন, ‘তারা বসে বসে মুচকি হাসলেন এবং সোনারগাঁও হোটেল থেকে খাবার এনে খেলেন— এসব জাতি জানে, সাংবাদিকরা আরও ভালো জানেন।’

হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাস্টারপ্ল্যানের অভিযোগ

রফিকুল ইসলাম খান দাবি করেন যে, সরকার ও সেনাবাহিনী কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখেনি। এর থেকে স্পষ্ট হয় যে, এটি কেবল ডালভাতের জন্য ছিল না। তার ভাষায়, ‘এই মাস্টারপ্ল্যান ছিল দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করে আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে দুর্বল করা এবং দেশের সীমান্তকে অরক্ষিত রাখা; যাতে তৎকালীন সরকারকে যারা ক্ষমতায় বসিয়েছে, তারা এই দেশকে তাদের করদরাজ্যে পরিণত করতে পারে।’

বিচার ও তদন্তের দাবি

সিরাজগঞ্জ থেকে নির্বাচিত এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘আজও সেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচিত হয়নি।’ তিনি উল্লেখ করেন যে, তৎকালীন সরকার বা দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকার— কেউই পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট জনগণের সামনে প্রকাশ করেনি। তিনি অবিলম্বে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদসহ সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।

রফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেই আসল ঘটনা জানা যাবে।’ এছাড়া তিনি উল্লেখ করেন যে, ওই ঘটনার পর বিডিআরের যে কর্মকর্তারা অস্বাভাবিক পদোন্নতি পেয়েছেন, তাদেরও তদন্তের আওতায় আনা উচিত। তার বক্তব্যে জামায়াতের স্থায়িত্ব, নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার— এই তিনটি মূল বিষয় উঠে এসেছে, যা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূত্রপাত করতে পারে।