প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসে নতুন সরকার: বদলি, চুক্তি বাতিল ও কর্মকর্তাদের উদ্বেগ
নতুন সরকার গঠনের পর প্রশাসনিক কাঠামো ঢেলে সাজানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থেকে এই প্রক্রিয়া তদারকি করছেন। এই পরিবর্তনের মধ্যে অনেক আমলা নিজেকে সরকারের আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ প্রমাণ করতে তৎপর হয়ে উঠেছেন। প্রশাসনের অভ্যন্তরে থাকা 'বর্ণচোরা' কর্মকর্তারা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন। অনেকে ছাত্রজীবনে 'ছাত্রদল' করার প্রমাণ সংগ্রহে ব্যস্ত কিংবা প্রভাবশালী বিএনপি নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সঙ্গে নিজেদের ঘনিষ্ঠতার কথা সহকর্মীদের সামনে তুলে ধরছেন। সচিবালয় ঘুরে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
প্রথম পদক্ষেপ: মুখ্য সচিব নিয়োগ ও তিন সচিব বদলি
প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রথম ধাপ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের মুখ্য সচিব পদে ৮২ ব্যাচের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম এ সাত্তারকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছেন। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে তাদের বর্তমান পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে তাদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত (ওএসডি সমতুল্য) সচিব হিসেবে বদলি করা হয়।
বদলীকৃত কর্মকর্তাদের তালিকা নিম্নরূপ:
- প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্না
- শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন
- ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিন
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, উল্লিখিত কর্মকর্তাদের তাদের বর্তমান কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো দফতর বা কর্মক্ষেত্র নেই। এর আগে চুক্তির মেয়াদ অবশিষ্ট থাকতেই নিজ থেকে পদত্যাগের আবেদন করে চাকরি ছেড়ে গেছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশিদ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এম সিরাজউদ্দিন মিয়া।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রশাসনিক সমীকরণ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের আমলের সুবিধাপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াতপন্থি কর্মকর্তারা তুলনামূলক স্বস্তিতে ছিলেন। আলোচনা রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রশাসনের চালিকাশক্তিতে ছিলেন জামায়াত-এনসিপির আশীর্বাদপুষ্ট কর্মকর্তারা। তবে নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর প্রশাসনের অভ্যন্তরে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এখন অনেকটাই চাপে রয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রভাবশালী হিসেবে বিবেচিত কর্মকর্তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সরকারের শীর্ষ প্রশাসনিক দফতর সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে এখন বদলি ও তদন্ত আতঙ্ক কাজ করছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সচিবালয়ে ব্যাপক রদবদল ও ওএসডি হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সচিবদের চুক্তি বাতিল ও বদলি, প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়া এবং নতুন সরকারের সঙ্গে মতাদর্শিক দূরত্বের কারণে প্রশাসনের শীর্ষপর্যায় থেকে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।
বিস্তৃত বদলি ও চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া
সূত্র জানিয়েছে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দফতরের সচিবদের বদলি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
এছাড়া নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও মাঠ পর্যায়ের ১১২ জন কর্মকর্তাকে একযোগে বদলি করা হয়েছে, যা আগামী ১ মার্চের মধ্যে কার্যকর হবে। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন করে পদায়ন এবং পুনর্বিন্যাসের তৎপরতা চলছে বলে জানা গেছে। একদিকে নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর আলোচনা চলছে, অন্যদিকে আগের সময়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন পরবর্তী প্রতিযোগিতা ও উদ্বেগ
জানা গেছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে ক্ষমতার পালাবদলের প্রভাব পড়তে শুরু করে। গুরুত্বপূর্ণ পদ নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়ে যায়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সেই প্রতিযোগিতা আরও দৃশ্যমান হয়েছে। সচিবালয়ে নতুন মন্ত্রীদের বরণের প্রস্তুতির পাশাপাশি কর্মকর্তাদের মধ্যে বদলি ও তদন্ত নিয়ে উদ্বেগও দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সে সময় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থায় ব্যাপকভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই সময়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ এখনও সচিব ও দফতর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, ঈদুল ফিতরের পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া অনেক কর্মকর্তার নিয়োগ বাতিল হতে পারে।
চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা ও অনিয়মের অভিযোগ
সরকারি কর্মচারী বাতায়নের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদমর্যাদার অন্তত ১৮ কর্মকর্তা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে কর্মরত রয়েছেন। তাদের অধিকাংশই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পান।
নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল শুরু হওয়ায় কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব পদসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ এখনো শূন্য রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে নতুন সচিব নিয়োগ দেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত হতে পারে—এমন আশঙ্কায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আরও পরিবর্তন আসতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল মিঞা বলেন, “যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বিগত সময়ে যেসব কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের পদায়ন ও পদোন্নতির জন্য জনপ্রশাসন সচিবকে অনুরোধ করা হয়েছে।” পদায়নের ক্ষেত্রে সততা, যোগ্যতা ও দক্ষতাকে প্রাধান্য দেওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতির অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেন, “সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনে রদবদল হওয়া স্বাভাবিক বিষয়। তবে দক্ষ প্রশাসন নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারকদের সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। যেহেতু সরকার গঠনের অল্প সময় হয়েছে, তাই প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের জন্য সরকারকে সময় দেওয়া প্রয়োজন।”
