বিএনপি সরকারের প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল শুরু
নতুন সরকার গঠনের পর প্রশাসনিক কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। এই রদবদলের অংশ হিসেবে গত সরকারের আমলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া ৯ জন সচিবের চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি তিনজন সচিবকে ওএসডি (অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি) করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংযুক্ত করা হয়েছে। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্রে এই তথ্য নিশ্চিত হয়েছে।
সচিব পদে প্রত্যাহার ও নতুন নিয়োগের প্রক্রিয়া
প্রশাসনিক আদেশে তিন সচিবকে তাদের মূল দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তারা হলেন:
- মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন
- প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাইফুল্লাহ পান্না
- ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কামাল উদ্দিন
অন্যদিকে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে দেওয়া চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল হওয়া ৯ জন সচিবের তালিকায় রয়েছেন:
- স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান
- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী
- জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক সিদ্দিক জোবায়ের
- বমি আপিল বিভাগের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ
- মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ
- পরিকল্পনা কমিশনের আলোচিত সিনিয়র সচিব ড. মো. মোখলেসুর রহমান
- পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) এম এ আকমল হোসেন আজাদ
- ড. কাইয়ুম আরা বেগম
- বিশ্ব ব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক বেগম শরিফা খান
সচিবালয়ের একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, শূন্য হওয়া এই ১২টি পদে নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে বিগত সময়ে পদোন্নতি ও পদায়নে বঞ্চিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দেওয়া হতে পারে। বিশেষ করে যারা যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাননি, তাদের মধ্য থেকেই নতুন সচিব বেছে নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক বঞ্চনা ও সম্ভাব্য পদায়ন
ধারণা করা হচ্ছে, বিএনপি ঘরানার বা নিরপেক্ষ হিসেবে পরিচিত দক্ষ কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ এই দফায় শীর্ষ পদে ফিরছেন। এর মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা বিভাগের দায়িত্ব পেতে পারেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার এপিএস নবম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. শামসুল আলম। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে বঞ্চনার শিকার এই সচিবকে কোনো মন্ত্রণালয় পদায়ন করেনি অন্তর্বর্তী সরকার।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে প্রেসিডেন্টের আদেশে পুনরায় চাকরিতে বহাল হন এবং ২০২২ সালেই তাকে সিনিয়র সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে সার-সংক্ষেপ প্রধান উপদেষ্টা ও প্রেসিডেন্ট অনুমোদন দিলেও তাকে পদায়ন করা হয়নি। সর্বশেষ গত জুলাই মাসে শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জুবায়ের অপসারণ করা হলে তাকে পদায়ন করার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে সরকার তাকে পদায়ন না করে রেহানা পারভীনকে সচিব করা হয়।
তাকে পদায়ন করতে শিক্ষার্থীর একটি দল বাংলাদেশ সচিবালয়ে গিয়ে অর্থ উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র সচিব ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে স্মারকলিপি দেয়। তারপরও শুধু খালেদা জিয়ার পিএস ছিলেন, এজন্য তাকে প্রদান করেনি। ২০০৮ সালের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যসহ প্রভাবশালী ৬২ জনের দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ সীমান্তের সব ইমিগ্রেশনে তালিকা পাঠিয়ে ছিল। সেই সময় হয়রানির শিকার হয়েছিলেন শামসুল আলম।
নতুন নিয়োগের তালিকা চূড়ান্ত পর্যায়ে
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন নিয়োগের তালিকা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সবুজ সংকেত পেলেই যেকোনো মুহূর্তে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। শূন্য হওয়া এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে চলতি সপ্তাহেই নতুন নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রশাসনের এই মেজর ওভারহলিং বা বড় রদবদলে সচিবালয়জুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও কৌতূহল বিরাজ করছে। কর্মকর্তারা নতুন পদায়নের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন, যা প্রশাসনিক কাঠামোতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
