ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন ১২ মার্চ, স্পিকার নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন ১২ মার্চ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে ১২ মার্চ

আগামী ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসবে। এই অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে, যা সংবিধান অনুযায়ী নতুন সংসদের প্রথম কাজ হিসেবে বিবেচিত। সাধারণত, বিদায়ী স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় এবং বৈঠকের শুরুতে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হয়।

সভাপতিত্ব নিয়ে জটিলতা

কিন্তু এবার পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে: স্পিকার নির্বাচনের সময় সভাপতিত্ব কে করবেন? ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি।

বিদায়ী স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করেন এবং এরপর তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। অন্যদিকে, বিদায়ী ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক (টুকু) হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এই 'অনুপস্থিতি'র কারণে, প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্বের দায়িত্ব কে নেবেন তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সংবিধান ও কার্যপ্রণালি বিধির বিধান

সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে বলা আছে, সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করতে হবে। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ৫ নং ধারা অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম অধিবেশনের পূর্বে সংসদ সদস্যদের শপথ নিতে হয় বিদায়ী স্পিকারের সামনে, অথবা তাঁর অনুপস্থিতিতে বিদায়ী ডেপুটি স্পিকারের সামনে। যদি উভয়েই অনুপস্থিত থাকেন, তবে বিদায়ী স্পিকার কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তির সামনে শপথ নেওয়া যায়।

এবার, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন জয়ী সদস্যদের গেজেট প্রকাশ করে। সংবিধান অনুযায়ী, তিন দিনের মধ্যে স্পিকার বা তাঁর মনোনীত ব্যক্তি শপথ না পড়ালে, পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) শপথ পড়াতে পারেন। এই বিধান অনুসারে, গত মঙ্গলবার সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান।

রাষ্ট্রপতির ভূমিকা ও বর্তমান আলোচনা

কার্যপ্রণালি বিধি আরও উল্লেখ করে যে, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয় পদ শূন্য থাকলে, স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংসদে সভাপতিত্ব করার জন্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত কোনো ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তবে, এবার সংসদ সদস্যদের শপথ পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রপতি কাউকে মনোনয়ন দেননি, যা নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে: স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সভাপতিত্বের জন্য রাষ্ট্রপতি কি কাউকে মনোনয়ন দিতে পারেন?

গতকাল রোববার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানান, আগামী ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতি সংসদ অধিবেশন আহ্বান করবেন। এ-সংক্রান্ত সারসংক্ষেপ জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর হয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে এবং রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে অধিবেশন আহ্বান করবেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, এই অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন ছাড়াও, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশগুলো উত্থাপন করা হবে, শোক প্রস্তাব ও রাষ্ট্রপতির ভাষণ হবে। তবে, প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব কে করবেন সে বিষয়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া

জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, স্পিকার নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত সময়ের অন্তত এক ঘণ্টা আগে যেকোনো সদস্য অন্য কোনো সদস্যকে স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত করার জন্য লিখিত প্রস্তাব দিতে পারেন, যা তৃতীয় একজন সদস্য কর্তৃক সমর্থিত হতে হয়। প্রস্তাবিত ব্যক্তিকে স্পিকার হিসেবে কাজ করতে সম্মতির বিবৃতি দিতে হয়। কোনো সদস্য নিজের নাম প্রস্তাব বা সমর্থন করতে পারবেন না এবং নির্বাচনের সময় সভাপতিত্বও করতে পারবেন না।

প্রস্তাবগুলো উত্থাপিত হওয়ার ক্রমানুসারে ভোটে দেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে বিভক্তি-ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে। একই পদ্ধতিতে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়। নির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে রাষ্ট্রপতি শপথ পড়ান, সাধারণত জাতীয় সংসদ ভবনে অবস্থিত রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে। নতুন স্পিকার শপথ নেওয়ার পর তিনি সংসদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন এবং তাঁর সভাপতিত্বে ডেপুটি স্পিকারের নির্বাচন হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

সংসদবিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ বলেন, এবার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়িয়েছেন। কার্যপ্রণালি বিধির ৫ ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির মনোনীত (প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে) কোনো ব্যক্তি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সভাপতিত্ব করতে পারেন।

অন্যদিকে, কার্যপ্রণালি বিধির ১২(২) বিধিতে বলা আছে, যদি সংসদের কোনো বৈঠকে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার বা সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের মধ্যে কেউই উপস্থিত না থাকেন, তবে সচিব তা সংসদকে জানাবেন এবং সংসদ একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে সভাপতিত্ব করার জন্য নির্বাচিত করবেন। তবে, এটি সংসদের প্রথম বৈঠকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি না, তা নিয়ে মতভিন্নতা রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন কেবল একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া নয়, বরং রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে সভাপতিত্বের প্রশ্নটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে।