সংগ্রামের সিঁড়ি বেয়ে নুরুল হক নুরের প্রতিমন্ত্রী হওয়ার গল্প
নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান নুরুল হক নুরের জীবনযাত্রা শুরু হয়েছিল পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাস ইউনিয়নের একটি সাধারণ পরিবারে। অল্প বয়সে মাকে হারানোর পর তার সংগ্রামী জীবনযাত্রা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। চাচাতো বোনের বাসায় থেকে এসএসসি পাশ করার পর নিজের অদম্য চেষ্টায় এইচএসসি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি।
শিক্ষাজীবন ও প্রাথমিক সংগ্রাম
পটুয়াখালীর চরবিশ্বাস ইউনিয়নের উত্তর চরবিশ্বাস গ্রামের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য পিতা মো. ইদ্রিস হাওলাদার ও মরহুমা নিলুফা বেগমের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন নুরুল হক নুর। শৈশবে বাড়ির পাশের মধ্য চরবিশ্বাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে ২০০৫ সালে চরবিশ্বাস জনতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। ২০০৭ সালে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত সেখানেই লেখাপড়া করেন।
এরপর গাজীপুরের কালিয়াকৈরে চাচাতো বোনের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং কালিয়াকৈর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। এইচএসসি পাশ করেন উত্তরা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে। চিকিৎসার অভাবে মা মারা যাওয়ায় নুরুল হক স্বপ্ন দেখেছিলেন ডাক্তার হওয়ার। উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করার পর মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ না পাওয়ায় প্রথমে ভর্তি হন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস সৃষ্টি
২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে সুযোগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে তৈরি করলেন ইতিহাস। দীর্ঘ ২৮ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রভাবশালী, পেশিশক্তি এবং প্রচলিত ধারার বিরুদ্ধে লড়াই করে ভিপি হিসেবে নির্বাচিত হন। শিক্ষার্থীদের কাছে অকল্পনীয় জনপ্রিয়তা অর্জনকারী নুরকে ভোট চুরি, সিল মেরে, ভোট প্রদানে বাধা দিয়েও পরাজিত করা যায়নি।
কোটা আন্দোলনের নেতৃত্ব ও চ্যালেঞ্জ
কোটা আন্দোলনের মাধ্যমে আলোচনায় আসা নুরুল হক নুরের পথটা ফুলে ফুলে সুশোভিত ছিল না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবির ভিত্তিতে গড়ে উঠা কোটা সংস্কার আন্দোলনেই নেতৃত্বে চলে আসেন নুর। শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
এ আন্দোলন করতে গিয়ে তাকে কয়েকবার শারীরিক নির্যাতন, হামলা, মামলা, আত্মগোপন, হত্যার হুমকিসহ হেন কোনো নির্যাতন ও অপমান নেই যার শিকার হতে হয়নি। সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের হামলার মুখে তাকে একপর্যায়ে নিজ আবাসিক হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ছাড়তে হয়। তারপরও দমে যাননি তিনি।
এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কখনো তাকে বানিয়েছে শিবির, কখনো আখ্যা দিয়েছে জঙ্গি হিসেবে, কখনো বা যুদ্ধাপরাধী কিংবা এজেন্ট নামে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়ানো হয়েছে তাকে নিয়ে করা নানা ব্যঙ্গ চিত্র, কুৎসা রটনাও ছিল না কম। তবে এর কোনো কিছুকে পাত্তা না দিয়ে নুরুল হক নুর সাধারণ ছাত্ররা যে দাবিতে তাকে সমর্থন ও সাহস জুগিয়েছে, এগিয়ে গেছেন তা নিয়ে।
ডাকসু নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়
দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত হওয়া ডাকসু নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ উঠলেও থামানো যায়নি নুরুল হক নুরের বিজয়। ছাত্রলীগের প্রার্থীকে প্রায় ২ হাজার ভোটে পরাজিত করে ভিপি নির্বাচিত হন পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চর বিশ্বাস ইউনিয়নের এ সন্তান। প্রথমে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে নুরুল হককে মেনে না নেওয়া হবে না উল্লেখ করে সংগঠনটির পক্ষ থেকে আন্দোলন করা হলেও পরবর্তীতে নুরুল হকের সঙ্গে ডাকসুতে কাজ করার কথা জানায় ছাত্রলীগ।
নির্বাচিত হওয়ার পরও ডাকসুতে শপথ নেবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহের তৈরি হয়েছিল। তবে নুরুল হক বলছেন, একমাত্র যাদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন সেই শিক্ষার্থীরা চাইলেই তিনি ডাকসুতে শপথ নেবেন। সাধারণ শিক্ষার্থীরা যদি মনে করে আমার ডাকসুতে শপথ নিয়ে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া উচিত তাহলে তা করব, অথবা তারা যদি মনে করে শপথ না নিয়ে পুনঃনির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখা উচিত তাহলে আমি তাই করব।
প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা ও দশমিনা) থেকে বিজয়ী গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। জীবনে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েই গত মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এ শপথ নেন।
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের ‘দ্বীপ’ ইউনিয়ন চরবিশ্বাসের এক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা ৩৪ বছরের নুরুল হক নুর সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
নুরুল হক নুরের বাবা ইদ্রিস হাওলাদার চরবিশ্বাস ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক সদস্য। নুরের বয়স যখন আড়াই বছর, তখন তার মা নিলুফা বেগম মারা যান। তিন ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। এই সংগ্রামী জীবনযাত্রার মাধ্যমে নুরুল হক নুর প্রমাণ করেছেন যে অদম্য মনোবল ও সৎ সংগ্রামের মাধ্যমে যে কোনো প্রতিকূলতা জয় করা সম্ভব।
