শহীদ মিনারে মোনাজাত: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি নতুন অধ্যায়?
এবারের মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে একটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নিয়েছেন। সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস একে 'ব্যতিক্রমী উদ্যোগ' বলে উল্লেখ করেছে, আর বিএনপি মিডিয়া সেল এটিকে 'অভূতপূর্ব দৃশ্য' হিসেবে বর্ণনা করেছে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, শহীদ মিনারে সরকারপ্রধানদের মোনাজাত এবারই প্রথম নয়।
১৯৭২ সালের ঐতিহাসিক ছবি: বঙ্গবন্ধুর মোনাজাত
প্রথম আলো ফ্যাক্ট চেক অনুসারে, স্বাধীনতার পরপরই শহীদ মিনারে মোনাজাতের ঘটনা ঘটেছে। ১৯৭২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন দৈনিক বাংলার প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত একটি ছবির ক্যাপশনে স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে, 'শহীদ মিনারে মোনাজাত করছেন বঙ্গবন্ধু।' এই দলিলটি প্রমাণ করে যে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে একই স্থানে মোনাজাত করেছিলেন।
এবারের দিবসের ঘটনাপ্রবাহ
শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে, শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে, প্রথমে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর উভয়েই কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেখানেই দাঁড়িয়ে ভাষাশহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেন। দোয়া পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের জ্যেষ্ঠ ইমাম ও খতিব হাফেজ মাওলানা নাজির মাহমুদ।
ভাষা আন্দোলনের পটভূমি
১৯৪৮ সাল থেকে শুরু হওয়া ভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। সেদিন ঢাকায় শাসকগোষ্ঠীর জারি করা ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল বের করেন ভাষার জন্য লড়াইরত এ দেশের ছাত্র-জনতা। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর পুলিশ মিছিলে গুলি চালালে সালাম, বরকত, রফিক, সফিউর, জব্বারসহ নাম না-জানা অনেক বীর সন্তানের রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। এরপর ১৯৫৬ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। প্রতি বছর জাতি কৃতজ্ঞচিত্তে সেসব ভাষাশহীদকে স্মরণ করে আসছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, শহীদ মিনারে মোনাজাত একটি রাজনৈতিক প্রতীক নাকি বিশুদ্ধ ধর্মীয় আচরণ? ইতিহাসের পাতায় বঙ্গবন্ধুর উদাহরণ থাকলেও, সাম্প্রতিক ঘটনাটি নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকের মতে, এটি ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার একটি গভীর প্রকাশ; আবার অন্যরা এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছেন। যাই হোক, এই আলোচনা ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলছে।
