প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জামায়াত আমীরের শ্রদ্ধা, বললেন 'রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের দায়িত্ব'
প্রথমবার শহীদ মিনারে জামায়াত আমীর, বললেন 'রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব'

ইতিহাসে প্রথম: শহীদ মিনারে জামায়াত আমীরের শ্রদ্ধা

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রথমবারের মতো ফুল দিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই মুহূর্তটি সম্ভব হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

রাতের শ্রদ্ধা নিবেদনে বিরোধী দলের উপস্থিতি

সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে শফিকুর রহমান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে রাত বারোটার পরপরই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পৌঁছান। তার সঙ্গে ছিলেন ১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা। যদিও দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রশিবির আলোচনা ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে এই দিবসটি পালন করে আসছে, তবে এর আগে কখনোই জামায়াতের কোনো আমীর সরাসরি শহীদ মিনারে ফুল দেননি। এবারের পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সেই রাতের শ্রদ্ধা নিবেদনের ধারাবাহিকতা ছিল সুস্পষ্ট। প্রথমে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা ফুল দেন, এরপর তিন বাহিনীর প্রধানরা শ্রদ্ধা জানান। তারপরই আসে সংসদে বিরোধী দলীয় ব্লকের পালা। শফিকুর রহমানের সঙ্গে এগিয়ে আসেন চীফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম, হাসনাত আবদুল্লাহ ও আখতার হোসেন।

উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ ও সাংবাদিকদের প্রশ্ন

শফিকুর রহমানের এই আগমন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ছিল না। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, শহীদ মিনারের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় পাল্টা স্লোগান ও কিছু উত্তেজনা পরিলক্ষিত হয়। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তিনি বেদিতে প্রার্থনা করেন এবং এরপর বেরিয়ে আসেন সাংবাদিকদের সামনে।

সাংবাদিকরা যখন জিজ্ঞাসা করেন, এত বছর পর কেন তিনি এখন শহীদ মিনারে এলেন, তখন শফিকুর রহমান জবাব দেন, "এটি রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের ব্যাপার হিসেবে আমার দায়িত্ব। বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে আমি আমার সহকর্মীদের সঙ্গে আসার কথা, তাই এসেছি।"

যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, জামায়াত এখনো কি শহীদ মিনারে ফুল দেওয়াকে ধর্মীয়ভাবে অনুচিত মনে করে, তখন তিনি বিরক্তির সঙ্গে পাশ ফিরে নেন এবং বলেন, "আপনারা আজ কেন এই প্রশ্ন করছেন? এত পবিত্র দিনে এমন প্রশ্ন না করাই ভালো।"

সকল শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সংগ্রামের অঙ্গীকার

শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে সকল শহীদদের স্মরণ করেন। তিনি বলেন, "আমরা সকল শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই, ৪৭-এর দেশভাগের আগে যারা প্রাণ দিয়েছেন, ৫২-এর ভাষা শহীদরা, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের শহীদরা, ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের শহীদরা এবং এরপর ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে যারা জীবন দিয়েছেন। বিশেষ করে আমরা সাড়ে পনেরো বছর ফ্যাসিবাদী শাসনে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের স্মরণ করি। সর্বশেষে, আমরা জুলাইয়ের যোদ্ধাদের স্মরণ করি, যারা এই জাতির অধিকার পুনরুদ্ধারে জীবন উৎসর্গ করেছেন। আমরা ওসমান হাদিকেও স্মরণ করি।"

ভাষা শহীদদের আকাঙ্ক্ষা কি কখনো পূরণ হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, "না, পূরণ হয়নি। আর সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্যই আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাব। যতদিন না এই জাতি সত্যিকার অর্থে মুক্ত হয়—ফ্যাসিবাদ, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি থেকে মুক্ত হয়, যতদিন না একটি সত্যিকারের মানবিক দেশ গড়ে ওঠে, ততদিন আমাদের সংগ্রাম চলবে। আমরা কোনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করব না।"

আজিমপুর কবরস্থানে ভাষা শহীদদের সমাধিতে প্রার্থনা

শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শফিকুর রহমান বিরোধী দলীয় প্রতিনিধি দল নিয়ে আজিমপুর কবরস্থানে যান। সেখানে তিনি তিন ভাষা শহীদের সমাধিতে প্রার্থনার নেতৃত্ব দেন। এই সফরটি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে বলে পর্যবেক্ষকরা মন্তব্য করেছেন।