চট্টগ্রামের মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব সর্বনিম্ন, বিএনপির নেতা-কর্মীরাও হতাশ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত মন্ত্রিসভায় চট্টগ্রামের প্রতিনিধিত্ব নেমে এসেছে মাত্র দুজনে, যা গত সাড়ে চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। ১৯৮২ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার দশকে এবারই সবচেয়ে কম মন্ত্রী পেয়েছে চট্টগ্রাম, যেখানে ২০০১ সালে বিএনপি সরকারে চট্টগ্রাম থেকে আটজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।
মাত্র দুজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী
এবার মন্ত্রিসভায় চট্টগ্রাম থেকে স্থান পাওয়া দুজনের একজন মন্ত্রী এবং অপরজন প্রতিমন্ত্রী। চট্টগ্রাম–১১ (বন্দর ও পতেঙ্গা) আসন থেকে নির্বাচিত আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, যিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, তাঁকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী করা হয়েছে। অন্যদিকে, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক, তাঁকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির নির্বাচনী সাফল্য ও প্রত্যাশা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের ১২টিতে জয়লাভ করে বিএনপি, যা জেলার জন্য একটি শক্তিশালী ফলাফল। দুটি আসনে বিএনপির প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও ফলাফল ঘোষণা স্থগিত রয়েছে। এই সাফল্যের পর চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা ছিল যে মন্ত্রিসভায় জেলার প্রতিনিধিত্ব বাড়বে, কিন্তু বাস্তবে তা কমে গেছে। জেলায় রাজনৈতিক কার্যক্রম তিনটি সাংগঠনিক জেলা শাখার মাধ্যমে পরিচালিত হয়: চট্টগ্রাম মহানগর, চট্টগ্রাম উত্তর ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ। এবার চট্টগ্রাম নগর ও উত্তরের প্রতিনিধিত্ব মন্ত্রিসভায় রয়েছে, তবে চট্টগ্রাম দক্ষিণ থেকে কেউ স্থান পাননি।
ইতিহাসে চট্টগ্রামের মন্ত্রিসভা প্রতিনিধিত্ব
মন্ত্রিসভায় চট্টগ্রাম থেকে সবচেয়ে বেশি স্থান হয় ২০০১ সালে, যখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারে চট্টগ্রাম থেকে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, এম মোরশেদ খান, এল কে সিদ্দিকী ও আবদুল্লাহ আল নোমানকে মন্ত্রী করা হয়। মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে, এবং মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন ও জাফরুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়। প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার হুইপ করা হয় ওয়াহিদুল আলমকে।
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মন্ত্রিসভায় চট্টগ্রাম থেকে চারজন স্থান পেয়েছিলেন, যার মধ্যে দুজন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত মন্ত্রিসভায় তিনজন পূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন, এবং ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনজন মন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৬, ১৯৯১ এবং ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্তও চট্টগ্রাম থেকে মন্ত্রীরা সরকারে ছিলেন, যা এবারের কম প্রতিনিধিত্বের বিপরীতে দাঁড়ায়।
বিএনপি নেতা-কর্মীদের হতাশা
মন্ত্রিসভায় চট্টগ্রামের প্রতিনিধিত্ব কম থাকায় জেলার বাসিন্দাদের পাশাপাশি হতাশ বিএনপির নেতা-কর্মীরাও। চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মন্ত্রিসভার আকার ছোট হওয়ার কারণে হয়তো এবার মাত্র দুজন ঠাঁই পেয়েছেন। আশা করি, মন্ত্রিসভার আকার বড় হলে অবশ্যই চট্টগ্রামকে সরকার গুরুত্ব দেবে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে বিএনপি চট্টগ্রামের উন্নয়নে বিশ্বাসী এবং সরকার চট্টগ্রামকে সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানী করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
বাণিজ্যিক রাজধানীর প্রতিশ্রুতি
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি চট্টগ্রাম, যেখানে দেশের মোট রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৭৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে চট্টগ্রামে এক জনসভায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবেন। তিনি মন্তব্য করেন যে গত ১৫ বছরে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, এবং এই উদ্যোগ গ্রহণ করলে শুধু চট্টগ্রামের মানুষ নয়, দেশে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে, ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা হবে।
এই পরিস্থিতিতে, চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব সত্ত্বেও মন্ত্রিসভায় এর কম প্রতিনিধিত্ব একটি বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা ভবিষ্যতে সরকারের নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
