গণতন্ত্রে প্রশ্ন করার অধিকার: বাংলাদেশে ভিন্নমতের সংস্কৃতি ও চ্যালেঞ্জ
গণতন্ত্রে প্রশ্ন করার অধিকার: বাংলাদেশের সংস্কৃতি

গণতন্ত্রের অপরিহার্য অনুষঙ্গ: প্রশ্ন করার অধিকার

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে ক্ষমতাকে নির্ভয়ে প্রশ্ন করার স্বাধীনতায়। স্বাধীন মতপ্রকাশ ও প্রশ্ন করার অধিকার না থাকলে, গণতন্ত্রের নামে স্বৈরতন্ত্রের বিকাশ ঘটে। দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশে গত পাঁচ দশক ধরে নির্ভয়ে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। যখন ভয় নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে, তখন স্বাধীনতার নামে পরাধীনতার শৃঙ্খল সমাজকে বন্দী করে। এর ফলে গণতন্ত্রের বিকাশ রুদ্ধ হয়, শাসকরা স্বৈরাচারে পরিণত হন এবং রাষ্ট্র অমানবিক হয়ে পড়ে। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা গণতন্ত্রের অনিবার্য অনুষঙ্গ, কিন্তু আমাদের সমাজ কি সেই পথে এগোচ্ছে?

আধিপত্যবাদের সংস্কৃতি ও প্রশ্নকারীদের সংগ্রাম

পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্র সর্বত্র আধিপত্যবাদের সংস্কৃতি বিদ্যমান। এমন পরিবেশে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা সহজ কাজ নয়। তবুও, মফস্বল থেকে রাজধানী পর্যন্ত কিছু সাহসী মানুষ প্রশ্ন করার জন্য দাঁড়িয়ে যান। কখনো কখনো এর ফলাফল নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। মফস্বলের সাংবাদিক প্রবীর শিকদার এর উজ্জ্বল উদাহরণ; তিনি ক্ষমতার বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন এবং ফলস্বরূপ পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। ক্ষমতা খুশি হলেন, কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতা প্রকাশ পেল।

লেখক ও সাংবাদিকদের ওপর নিপীড়ন

এবিএম মূসা, একজন লেখক ও সাংবাদিক, শৈশব থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধের অনুসারী হিসেবে দেখেছেন। আওয়ামী লীগের চরম দুর্দিনেও তাঁর কলম থামেনি। কিন্তু একসময় প্রশ্ন করা তাঁর জীবনে কাল হয়ে দাঁড়াল এবং তিনি ক্ষমতার চক্ষুশূল হয়ে গেলেন। তাঁর মৃত্যুতেও শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের চোখে পানি আসেনি। অন্যদিকে, গাফ্ফার চৌধুরী, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের পাশে ছিলেন। কিন্তু যখন সত্য বিপক্ষে চলে গেল, তিনিও ক্ষমতার চক্ষুশূল হয়ে উঠলেন। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে শুরু করায় তাঁর ওপর তিরবর্ষণ শুরু হয়, এবং শেষবিদায়টি ছিল অনাড়ম্বর।

প্রশ্নকারীদের ওপর নিপীড়ন ও প্রতিষ্ঠানের দমন

ক্ষমতাকে প্রশ্ন করলে জীবন বিপন্ন হয়, কারাগারের প্রকোষ্ঠ ও রিমান্ড অনিবার্য হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগের অনুসারীদের জামায়াত-বিএনপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, আবার বিএনপির অনুসারীদের 'র' এর এজেন্ট বলা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে প্রতিকৃতি বানিয়ে জুতার মালা পরানো হয়। প্রশ্নকর্তাদের দুদকের জালে আটকে দেয়ালবন্দী করা হয়, যেমনটি দেখা গেছে আব্দুন নূর তুষার ও আনিস আলমগীরের ক্ষেত্রে।

শুধু ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানও ক্ষমতাকে প্রশ্ন করলে বিপন্ন হয়। আধিপত্যবাদ প্রশ্নের মুখে পড়লে গণভবনের চারদেয়ালে ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, একুশে টিভির মতো সংবাদমাধ্যম নিষিদ্ধ হয়ে যায়। জনকণ্ঠ দখল হয়ে যায় এবং 'আমার দেশ' তালাবদ্ধ হয়। সাংবাদিক ও সম্পাদকদের দেশান্তরি হতে হয়, এবং বাঁচার জন্য ক্ষমতা-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সম্পাদক বানানো হয়। কেউ স্বেচ্ছায়, কেউ শান্তির অন্বেষায় আবার কেউ বাধ্য হয়ে এই পথ বেছে নেয়।

প্রশ্নকারীদের সুরক্ষার অভাব ও সুবিধাবাদের জন্ম

প্রশ্নকর্তার সুরক্ষা না থাকায় সুবিধাবাদের জন্ম হয়। প্রশ্নকর্তা যে সময় নিয়ে প্রশ্ন করেন, তার দশগুণ সময় তারা স্তুতি বাক্য আওড়ান। ক্ষমতাকে নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয়, এবং ক্ষমতার পিতা-মাতাকেও মহামানব বানানো হয়। সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রশ্নকর্তার অনুকূলে না থাকায় প্রশ্ন করা সহজ নয়। প্রশ্নকর্তার তথ্য ক্ষমতার অনুকূলে না গেলে রক্তচক্ষুর চাহনি সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেড়ায়।

২৪-এর অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় ও আশার আলো

২৪-এর অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অনেকেই ভেবেছিলেন ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার মোক্ষম সময় এসেছে। ঢাকেশ্বরী মন্দিরে সরকারপ্রধান যখন বললেন, 'আপনারা মন খুলে কথা বলুন, যা খুশি তা লিখুন', তখন অনেকেই সাহসী হওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই প্রেসার গ্রুপ নামক দানবীয় মবোক্রেসি ক্ষমতার পাশে দাঁড়িয়ে গেল, এবং শারীরিক ও মানসিক নিগ্রহ নৈমিত্তিক হয়ে উঠল। অধ্যাপক ইউনূস আশা জাগিয়েছিলেন, কিন্তু সেই স্বপ্ন ফিকে হতে বেশি সময় লাগেনি।

মানবাধিকার ও সাংবাদিক নিপীড়নের পরিসংখ্যান

প্রশ্ন করা একটি মানবিক অধিকার, কিন্তু স্বৈরতন্ত্র প্রশ্নকে ভয় পায়। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বিগত এক বছরে ৩৮১ জন সাংবাদিক নিগৃহীত হয়েছেন। এর মধ্যে তিনজন নিহত হয়েছেন, চারজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, ১১৮ জন সরাসরি হামলার শিকার হয়েছেন, ২০ জনের ওপর মৃত্যু পরোয়ানার হুমকি জারি হয়েছে এবং ১২৩ জন সংবাদ প্রকাশের জন্য মামলার মুখোমুখি হয়েছেন।

পশ্চিমের দেশগুলোর সাথে তুলনা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

পশ্চিমের দেশগুলিতে ক্ষমতাকে তির্যক প্রশ্নবাণে জর্জরিত করার সংস্কৃতি রয়েছে। উত্তর যথাযথ না হলে ক্ষমতা কেঁপে ওঠে, এবং গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্র প্রশ্নকারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করে। কিন্তু বাংলাদেশের সমাজের চিত্রটি এর সম্পূর্ণ বিপরীত। ক্ষমতা অখুশি হলে প্রশ্নকর্তাকে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়, এবং শারীরিক ও মানসিক হেনস্তার শত সহস্র দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেমন প্রথম আলোর রোজিনা ইসলামের ঘটনা।

নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও তারেক রহমানের ভূমিকা

এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নতুন এক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। লন্ডন থেকে ঢাকার মাটিতে ফিরে তারেক রহমানের প্রতিটি কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সুবাতাস ছড়াচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে রূঢ়তা বা প্রতিহিংসার ইঙ্গিত নেই, এবং তিনি নিজেকে ও নিজের দলকে অশালীনতা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছেন। এমন দৃষ্টান্ত সামনে থাকায়, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার সুযোগ উন্মোচিত হতে পারে।

তোষামোদকারীদের পরিণতি ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

অতীতে কেউ বাধ্য হয়ে, কেউ প্রাপ্তির প্রত্যাশায় ক্ষমতাকে তোষামোদ করেছেন। আজ এই তোষামোদকারীদের অনেকেই নিষ্ঠুর প্রায়শ্চিত্ত করছেন। নির্ভয় ও আইনের সংস্কৃতি চালু থাকলে, এদের অনেকেই হয়তো তোষামোদকে বেছে নিতেন না। ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা থাকলে শুদ্ধাচারের সংস্কৃতি লাভবান হতো। তারেক রহমান কি পারবেন সেই সংস্কৃতির কান্ডারি হতে? সময়ই তা বলবে।