ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ২৬ ফেব্রুয়ারিতে বসতে পারে
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন ২৬ ফেব্রুয়ারিতে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন চলতি মাসের ২৬ ফেব্রুয়ারি তারিখে শুরু হতে পারে বলে জানা গেছে। সংসদ সচিবালয়ের একাধিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, এই তারিখটি নিয়ে ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিক আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে।

সংবিধানগত বাধ্যবাধকতা

বাংলাদেশের সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশিত হওয়ার পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি এই দায়িত্ব পালন করেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের গেজেট ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করা হয়েছে। সেই হিসাবে, ১৪ মার্চের মধ্যে সংসদের প্রথম অধিবেশন বসা বাধ্যতামূলক।

শপথ ও অধিবেশনের সময়সূচি

সংসদ সদস্যরা ইতিমধ্যে ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণ করেছেন। সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন সম্পন্ন হলেও পুরোনো সংসদের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন সংসদের অধিবেশন বসে না। বিগত তিনটি নির্বাচনে এই নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, দ্বাদশ সংসদের সদস্যরা ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি শপথ নিলেও প্রথম অধিবেশন বসেছিল ৩০ জানুয়ারি, কারণ একাদশ সংসদের মেয়াদ শেষ হয়েছিল ২৯ জানুয়ারি। তবে এবার সংসদ না থাকায় অধিবেশন শুরু করতে অতিরিক্ত সময় অপেক্ষা করতে হবে না।

সচিবালয়ের বক্তব্য

সংসদ সচিবালয় সূত্রে প্রকাশ, প্রথম অধিবেশন বসার তারিখ নির্ধারণ নিয়ে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈঠকে ২৫ কিংবা ২৬ ফেব্রুয়ারি তারিখে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

তবে বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা জানিয়েছেন, "অধিবেশন বসার বিষয়ে আমরা এখনো কোনো নির্দেশনা পাইনি।" ২৬ ফেব্রুয়ারি অধিবেশন বসা নিয়ে আলোচনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, "আমরা এখনো শুনিনি। তবে শপথ গ্রহণের এক মাসের মধ্যে সংসদ অধিবেশন বসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।"

নির্বাচনী ফলাফল

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ হয়েছে। এ পর্যন্ত ২৯৭টি আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে:

  • বিএনপি ২০৯টি আসনে জয়লাভ করেছে
  • বিএনপির জোটের তিন শরিক দল তিনটি আসনে বিজয়ী হয়েছে
  • ফলাফল স্থগিত থাকা দুটি আসনেও বিএনপির প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন
  • জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসনে জয়ী হয়েছে
  • জামায়াতের ১১ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছয়টি আসনে বিজয়ী হয়েছে
  • বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি ও খেলাফত মজলিস একটি আসনে জয়লাভ করেছে
  • ইসলামী আন্দোলন একটি আসনে বিজয়ী হয়েছে
  • স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সাতটি আসনে জয়ী হয়েছেন, যারা বিএনপির বিদ্রোহী হিসেবে পরিচিত

অধিবেশনের কার্যক্রম

সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি। এই ভাষণটি আগে মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করা হয়। প্রথম অধিবেশনজুড়ে সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর বিস্তারিত আলোচনা করবেন।

সভাপতিত্ব সংক্রান্ত জটিলতা

জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেন। এর আগে আগস্টে ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু গ্রেফতার হন। তাদের অনুপস্থিতিতে সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানো ও সংসদে সভাপতিত্ব করার জন্য রাষ্ট্রপতি কাউকে মনোনীত করেননি। ফলে এবার সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।

শুধু সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য রাষ্ট্রপতি আলাদা করে প্রতিনিধি মনোনীত করতে পারবেন কি না, জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। এমন পরিস্থিতিতে সংসদের প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন, তা নিয়ে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারাও নিশ্চিত নন।

১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচনের পর সরকারি ও বিরোধী দলের আলোচনার মাধ্যমে জ্যেষ্ঠ একজন সদস্যকে সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার দায়িত্ব দিয়ে স্পিকার নির্বাচন সম্পন্ন করার নজির রয়েছে। সূত্র জানায়, এবারও তেমনটি হতে পারে। এমন কোনো সদস্যের সভাপতিত্বে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর অধিবেশনের সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন ও শোকপ্রস্তাব আনা হবে। এরপর ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তার ভাষণের মধ্য দিয়ে অধিবেশনের প্রথম দিনের বৈঠক মুলতবি হবে।

দলীয় নেতৃত্ব

ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদীয় দল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সংসদ নেতা নির্বাচিত করেছে। তবে দলটি এখনো স্পিকার, উপনেতা ও চিফ হুইপ নির্ধারণ করেনি। অন্যদিকে বিরোধী দল জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সংসদীয় দল জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানকে বিরোধীদলীয় নেতা, নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহেরকে উপনেতা এবং এনসিপির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলামকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নির্বাচিত করেছে।

জুলাই জাতীয় সনদ ও ক্ষমতাসীন বিএনপির ইশতেহার অনুযায়ী, এবার বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার হওয়ার কথা রয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে সংসদীয় কার্যক্রম শুরুর আগেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।