সংবিধান সংস্কার বনাম সরকারের ১৮০ দিন: বিএনপির শপথ বিতর্ক ও নতুন অগ্রাধিকার
বিএনপির শপথ বিতর্ক ও সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার

সংবিধান সংস্কার পরিষদ বনাম সরকারি অগ্রাধিকার: বিএনপির শপথ প্রত্যাখ্যান ও নতুন পরিকল্পনা

সংসদ সদস্যদের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে ১৮০ দিন দায়িত্ব পালনের প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের সূচনা হয়েছে। মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার আগে বিএনপি স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেয় যে, তারা পরিষদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হননি এবং সংবিধান মানলে এই শপথ গ্রহণ করা যাবে না। এই অবস্থানের ফলে ১৮০ দিনের হিসাব বদলে যায়, যদিও সরকার বুধবার তার প্রথম কার্যদিবসে আবারও ১৮০ দিনের সময়সীমা ফিরিয়ে এনেছে। তবে এই সময়ে সরকার কী কী করবে এবং কোন বিষয়গুলোতে প্রাধান্য দেবে, তা বিস্তারিতভাবে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ, বিএনপির উল্লেখিত ১৮০ দিনের সঙ্গে জুলাই সনদের ১৮০ দিনের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করা হচ্ছে।

ঐকমত্য কমিশনের বক্তব্য ও প্রশ্নের উদ্রেক

ঐকমত্য কমিশনের কাজ সম্পন্ন করার পর কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ বলেছিলেন, "১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অতীতের ১২টি নির্বাচনের মতো নয়। এই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ প্রথম দিন থেকেই সরকার পরিচালনা করবে, তবে তারা পাশাপাশি ১৮০ দিন এটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবে।" তখনই প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, সেটা কীভাবে সম্ভব হবে? এদিকে, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত গণভোটের ফলাফল বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে। রিটে হাইকোর্টের কাছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর জন্য রুল জারির আবেদন জানানো হয়েছে— কেন ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না।

সংবিধান সংস্কার ও ক্ষমতা হস্তান্তরের বিভ্রান্তি দূরীকরণ

সংবিধান সংস্কার পরিষদের কাজের জন্য ক্ষমতা হস্তান্তর পিছিয়ে যাবে কিনা– এমন বিভ্রান্তি দূর করে আলী রীয়াজ বলেন, “সংসদ সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করলে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথে বাধা তৈরি হবে– এমন ধারণা মোটেই সঠিক নয়। সংসদ প্রথম দিন থেকেই নির্বাচিত হওয়ার পর তার স্বাভাবিক কার্যাবলি যেমন- সরকার গঠন, দেশ পরিচালনা ও বাজেট তৈরির কাজ করবে। তবে বিদ্যমান সংবিধানকে ফ্যাসিবাদের পথ থেকে সরিয়ে আনতে মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজন। এ জন্য নির্বাচিত সদস্যরা আলাদা শপথ নিয়ে ১৮০ দিনের মধ্যে সংস্কারের কাজ শেষ করবেন।”

সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার ঘোষণা

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার শুরুর দিনেই সেই ১৮০ দিনের কথাই উল্লেখ করলেন। কেবিনেট মিটিং শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “সরকারের প্রথম দিন একটা কেবিনেট মিটিং করতে হয়। আমরা সবাই বসেছি। প্রধানমন্ত্রী আমাদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন, কিছু অনুশাসন দিয়েছেন।” তিনি বলেন, “সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হয়। আমরা এবার ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছি।” সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, সরবরাহ চেইন ঠিক রাখা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে যেন সমস্যা না হয়, গ্যাস-বিদ্যুতের প্রতি লক্ষ্য রাখা প্রাথমিক অগ্রাধিকার বলে জানান সালাহউদ্দিন।

জনগণের ম্যান্ডেট ও রোডম্যাপ উপস্থাপন

তিনি আরও বলেন, “প্রধানমন্ত্রী প্রথা অনুযায়ী সচিবদের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছেন। তাদের বলেছেন যে, জনগণ আমাদের ম্যানিফেস্টোর ওপর ম্যান্ডেট দিয়েছে। সুতরাং, যেটা জনগণের ইচ্ছা সেটাই প্রাধান্য পাবে। সে হিসেবে সরকারের ম্যানিফেস্টো বাস্তবায়নের জন্য তারা আন্তরিক হবেন।” প্রথমদিনের সভার বিষয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, “সরকারের অগ্রাধিকার ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে শিগগিরই একটি ১৮০ দিনের রোডম্যাপ উপস্থাপন করা হবে।” তিনি বলেন, “জনগণের প্রত্যাশা পূরণে অপ্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত কাজ শুরু করাই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।”

রমজান ও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

তিনি বলেন, “আগামীকাল থেকে পবিত্র রমজান শুরু হচ্ছে। এ সময়ে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ, বাজার নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সব মন্ত্রণালয় ও দফতরকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।” সব মিলিয়ে এখন ১৮০ দিনের কাজ শুরু হবে সরকারের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে। দেখার বিষয় কী কী থাকে সেই অগ্রাধিকারের তালিকায়।

বিএনপির অবস্থান ও বিশ্লেষকদের মতামত

উল্লেখ্য, মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়া প্রসঙ্গে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “এটাতো সাংবিধানিকভাবে করতে হবে। সংবিধান পরিবর্তনের আগে সেটা এই মুহূর্তে করার সুযোগ নেই। সাংবিধানিকভাবে সংসদ চলতে হবে তো।” জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার মাসুদ কামাল বলেন, “যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলা হচ্ছিল, সেটা মুর্খতা ও গোয়ার্তুমির মিশেল। আর এর পক্ষে মববাজি করেছে কয়েকটি পক্ষ। সেই ভয়ে বিএনপি তখন প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেনি। তবে কখনোই মনে প্রাণে মেনে নেয়নি। ওনাদের উচিত ছিল বলা যে, এই জুলাই সনদ পরের সংসদের হাতে তুলে দেওয়া, তারাই ঠিক করবে— কোনটা করবে বা কোনটা বাস্তবায়ন করবে না।” তিনি বলেন, “বিএনপি বলেনি, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে না। তারা সেটা করবে, তাদের নিজেদের ৩১ দফা, সেটা বাস্তবায়ন করবে। তবে শুরুতে তারা যে তিনটি ইস্যু ঠিক করেছে— দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা ও বিদ্যুৎ জ্বালানি, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই সনদ আছে, সেটা নিয়ে কাজ হবে। কিন্তু বাস্তবায়নে যে উদ্ভট প্রক্রিয়া, সেটার মাধ্যমে যে বাস্তবায়ন হবে না, এটা এখন নিশ্চিত করে বলা যায়।”