২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রথম সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তারেক রহমান। ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) তিনি ৪৯ সদস্যের বিশাল মন্ত্রিসভা নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই মন্ত্রিসভার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ও রাজপথের লড়াইয়ে পরিচিত দুই মুখ নুরুল হক নূর এবং জোনায়েদ সাকির অন্তর্ভুক্তি।
নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের সূচনা
প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এই দুই নেতাকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূর পটুয়াখালী থেকে বিএনপির সমর্থন নিয়ে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে দেশজুড়ে পরিচিতি পাওয়া ৩৪ বছর বয়সি নূর ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
জোনায়েদ সাকির রাজনৈতিক পটভূমি
অন্যদিকে, বামপন্থি রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত ৫২ বছর বয়সি জোনায়েদ সাকি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসন থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি ছাত্র ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি এবং বর্তমানে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক। দুই নেতার কেউই বিএনপির মূল দলের সদস্য না হলেও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির দীর্ঘদিনের মিত্র হিসেবে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন।
মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির পেছনের কারণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নূর এবং সাকিকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার পেছনে মূলত দুটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি জুলাই অভ্যুত্থানে তাদের বীরত্বপূর্ণ অবদানের একটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। দ্বিতীয়ত, বিএনপি তাদের জোটসঙ্গীদের যথাযথ মূল্যায়ন করার একটি বার্তা দিতে চেয়েছে। তবে সিনিয়র নেতাদের সরিয়ে তাদের পূর্ণ মন্ত্রী করা বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল বলে তাদের আপাতত জুনিয়র মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ শাহান মনে করেন, এটি মূলত জোটের অংশীদারদের পুরস্কৃত করার এবং দীর্ঘ লড়াইয়ের স্বীকৃতি দেওয়ার একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল। এদিকে, ২০২৪ সালের আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত শিক্ষার্থী নেতাদের দল 'জাতীয় নাগরিক পার্টি' (এনসিপি) এই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। তবে প্রথম নির্বাচনি পরীক্ষায় তারা খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। ৩০টি আসনের মধ্যে মাত্র ৬টিতে জয়লাভ করেছে তারা। দলের নেতা নাহিদ ইসলাম জয়ী হয়ে কনিষ্ঠতম সংসদ সদস্যদের একজন হিসেবে সংসদে বিরোধী দলে যোগ দিচ্ছেন।
বিরোধী ব্লক মোকাবিলার কৌশল
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জোনায়েদ সাকি ও নূরকে সরকারে টেনে নিয়ে তারেক রহমান মূলত সংসদে শক্তিশালী হতে চাওয়া জামায়াত ও শিক্ষার্থী নেতাদের বিরোধী ব্লককে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার কৌশল নিয়েছেন। নতুন এই মন্ত্রিসভার সামনে এখন রাষ্ট্র সংস্কার এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার কঠিন চ্যালেঞ্জ। অভিজ্ঞতাহীন একঝাঁক তরুণ নেতাকে নিয়ে তারেক রহমান কীভাবে আগামীর বাংলাদেশ পরিচালনা করেন, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
এই মন্ত্রিসভা গঠন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, যেখানে রাজপথের লড়াইয়ের নেতারা সরাসরি সরকারি দায়িত্বে অংশগ্রহণ করছেন। এটি ভবিষ্যত রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
