বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: ইতিহাসের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ
তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রীত্ব: ইতিহাসের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: ইতিহাসের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ইতিহাস সবাইকে সমান সুযোগ দেয় না, কাউকে কাউকে স্টেটসম্যান হওয়ার সুযোগ দেয়। কেউ সেই সুযোগ ধারণ করতে পারেন, আবার কেউ বুঝে ওঠার আগেই সব সম্ভাবনা জলাঞ্জলি দেন। জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা যায়, 'ইতিহাস শেখ সাহেবরে স্টেটসম্যান অইবার একটা সুযোগ দিছিল। তিনি এইডা কামে লাগাইবার পারলেন না।'

১৯৭২ সালের পরিস্থিতি ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে বিপুল সংকট ও সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু সেগুলো যথাযথভাবে মোকাবিলা করা যায়নি। রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করে নেতারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, দল ভেঙে পড়ে ভেতর ও বাইরে থেকে। মানুষ হতাশায় নিমজ্জিত হন, একটার পর একটা অঘটন ঘটতে থাকে, যার পরিণতি ছিল পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের ভয়াবহ ঘটনা।

বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় কাছাকাছি এক ধরনের অবস্থায় আছে। গত পঞ্চান্ন বছরে নানা রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রিক সংকট এসেছে, কিন্তু সেগুলোর বৈশিষ্ট্য এখনকার তুলনায় ভিন্ন। জাতীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতি মিলিয়ে বাংলাদেশ জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গের ওপর বসে আছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ধরে রাখা গেলে এই সংকট তৈরি হতো না।

বিএনপির বিজয় ও জনগণের প্রত্যাশা

বহু বৈচিত্র্যময় বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ, নারী, অসাম্প্রদায়িকতা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ভিন্নমত কোণঠাসা হয়ে পড়েছে, অনেক ক্ষেত্রে দক্ষিণপন্থা নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে। নির্বাচন ঠেকানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে নানা ইস্যুর ধুয়া তুলে। ফলে চব্বিশের ৫ আগস্টের পর রাষ্ট্র সংস্কারের বিপুল সম্ভাবনা যথাযথভাবে প্রস্ফুটিত হতে পারেনি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণ বিএনপিকে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী করেছে। যে রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে বাংলাদেশ ঢুকে যাচ্ছিল, সেখানে বিএনপির শক্ত প্রচারণা ও অবস্থান জনগণের সিংহভাগ অংশকে আশ্বস্ত করতে পেরেছে যে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের পথ ধরেই চলবে। জুলাই আন্দোলনের সময় 'বিকল্প কে?' প্রশ্নের উত্তরে ছাত্র–জনতা বলেছিল, 'তুমি ও আমি।' কিন্তু গত ১৮ মাসে মানুষ মববাজি, জ্বালাও পোড়াও, ভাঙচুর, নারীর প্রতি অসম্মান, অনলাইনে বট আক্রমণ ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার তাণ্ডবলীলা দেখেছে।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির গণজোয়ার

১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালট বিপ্লবের মধ্য দিয়ে মানুষ জানিয়ে দিয়েছে, তাঁর কাছে সব সময়ই বিকল্প থাকে। দল যেটাই হোক, তাদের অতীত শাসনামল যেমনই হোক, মানুষ সেসব বিবেচনায় নেয়নি। তাদের বিবেচনায় ছিল ঘটমান বর্তমান ও দেশের জন্মলগ্নের রক্তাক্ত ইতিহাস। সেখানে পক্ষ একটাই—মুক্তিযুদ্ধ, পন্থা একটাই—মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ। ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে এই ভোট মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির গণজোয়ারে পরিণত হয়েছে।

বিএনপির গৌরব ও চাপ

মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগতিশীল বাংলাদেশের পক্ষে এটা বিএনপিকে জনগণের উপহার। বিএনপি যতটা জিতেছে, তার চেয়েও বেশি প্রগতিপন্থী জনগণ তাকে জিতিয়েছে। রাজনৈতিক দল হিসেবে এই অর্জন গৌরবের, কিন্তু এটা প্রভূত চাপেরও। আদর্শিক, গাঠনিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক—কোনো দিক দিয়েই বাংলাদেশ ঠিক অবস্থায় নেই; না দেশে, না বিদেশে। নির্বাচনের আগে অনেক কথা বলা যায়, কিন্তু সামনের বাধা পাড়ি দেওয়ার চ্যালেঞ্জ কম নয়।

ভোটের পর বিএনপির বৃহস্পতি এখন তুঙ্গে, জনগণ তাদের বৈতরণি পার করে দিয়েছে। কিন্তু গত ২০০৬-২০২৬, এই ২০ বছরের রাজনৈতিক শূন্যতা ও চর্চার অভাব তাদের দূর হয়েছে কি? নির্বাচনে জিতলেই কি বলা যাবে বিএনপি সুসংগঠিত দল? এখন 'দুধের মাছি বাড়বে' স্বভাবতই, তখন কি বিএনপি পার্টি হিসেবে ঠিকঠাক কাজ করতে পারবে? তারাও কি গুপ্তজীবীদের কবলে পড়বে?

রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার সংকট

একটি দেশের সবকিছুই ঠিক হওয়া সম্ভব, যদি রাজনীতি ঠিক হয়। আর রাজনীতি ঠিক করার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র বা সরকার নয়; মূলত রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বড় সংকট রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার সংকট। রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার ফাঁপরে পড়ে নেতারা রাজনৈতিক দল বিকাশের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েন, বিপদের দিনে শেষ রক্ষা হয় না।

দেশে এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ আওয়ামী লীগ। গত ১৭ বছর এই দল দলীয় শক্তি হিসেবে মোটেও কার্যকর ছিল না। ক্ষমতার দম্ভে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হতে আজকে তার এই পরিণতি। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল—সর্বত্র এই বিচ্ছিন্নতা গ্রাস করে ফেলেছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব নিজেদের রাজনীতি ঠিকঠাক করেনি, গুপ্তজীবীদের দলে পরিণত হয়েছিল। আরেক দিকে তারা বিএনপির মতো শক্তিশালী বিরোধী দলকে দাঁড়াতে দেয়নি, জাতীয় পার্টিকেও গৃহপালিত বিরোধী দল বানিয়ে দলটাকে শেষ করে দিয়েছে।

তারেক রহমানের সামনের পথ

তারেক রহমান দেশে ফিরলেন দীর্ঘ ১৭ বছর পর। নির্বাচনের আগে গত দেড় মাসে তিনি ৬৪টি জনসভা করেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ক্ষমতার স্বাভাবিক নিয়মেই জনগণের সঙ্গে তাঁর একধরনের দূরত্ব তৈরি হবে। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তাঁকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে এক 'প্রকোষ্ঠে' ঢুকিয়ে ফেলবে। কিন্তু জনগণের মাঝে তারেক রহমানের থাকা দরকার, আরও বেশি বেশি দেশের আনাচকানাচে ঘুরতে পারলে দল গোছানোর কাজ হতো ও জনগণের সঙ্গে সরাসরি মেশার সুযোগ পেতেন তিনি।

তারেক রহমানের কাছে জনগণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা। বাংলাদেশের আজকের সংকট এত জটিল যে সর্বজনীন নেতা, তথা ত্রাতা হওয়ার জন্য আপাতত একজনই আছেন। অন্যদিকে বিএনপির অনেক বর্ষীয়ান নেতারই হয়তো এবারই শেষবার, তাঁদেরই কেউ হয়তো রাষ্ট্রপতি হবেন, কেউ হয়তো মন্ত্রী হবেন। সবাই যদি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তাহলে দলের এই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চর্চার শূন্যতা পূরণ হবে কী করে?

শেষ কথা

বাংলাদেশের সমস্যা হলো জুতা সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ ক্ষমতাসীন দলের প্রধান যিনি, তাঁকেই করতে হয়; কেননা, সবার আশা-ভরসা তিনি। আবার ভুল করলে খড়্গটা তাঁর ওপরেই পড়ে। 'এক নেতা/নেত্রীর এক দেশ' ধারণার এই হলো বিপদ। নিঃসন্দেহে তারেক রহমান এই মুহূর্তে বাংলাদেশের 'মোস্ট ভ্যালুয়েবল' নেতা তথা নাগরিক। শক্তিশালী রাজনৈতিক সংস্কৃতি তথা উদারনৈতিক প্রগতিপন্থী রাজনৈতিক দল বিকশিত করার জন্য তাঁর দিকেই আমাদের চেয়ে থাকতে হবে।

তারেক রহমানের সামনে 'স্টেটসম্যান' হওয়ার সুযোগ এসেছে। সেটা কি তিনি সরকারপ্রধান হিসেবে হবেন, নাকি দলীয় প্রধান হিসেবে হবেন, নাকি সব ভূমিকা একত্র করে হবেন, সেটাই দেখার বিষয়। যেটাই ঘটুক আর যে ভূমিকাতেই তিনি থাকুন না কেন, পরিকল্পনার ভরকেন্দ্র তাঁর দিকেই ঝুঁকে থাকবে।